ঢাকা, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭  ,
২০:১৭:২২ জুন  ২৩, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


সেবা মানের অবনতি: বিআরটিএ-র জবাব কি

এম. রেজাউল করিম




কাগজপত্র জমা দিয়ে প্রায় দু’ঘণ্টা ঘোরাঘুরির পর ‘ছবি তোলা’ এবং ‘ফিঙ্গার প্রিন্ট’ দেয়ার কাজটি সম্পন্ন হলো। ২ মাসের একটা লম্বা তারিখ দিয়ে বলা হলো, তারিখ অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হবে। ভদ্রলোকের আক্কেল গুড়–ম হবার যোগাড় আর একবার। তিনি সামনের সপ্তাহে পিএইচডি করতে তিন বছরের জন্য স্ত্রী-সন্তান, পোটলা-পুঁটলি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার হাওয়াই জাহাজে উঠবেন





ব্যক্তিগত ও বিভিন্ন দপ্তরের মোটরযানের নানাবিধ কাজের প্রয়োজনে অমাকে মাঝে-মধ্যেই ‘বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি’ বিআরটিএ কার্যালয় মিরপুরে যেতে হয়। স্বীকার করতেই হয়, বছর কয়েক আগে ঐ অফিসের ‘তোঘলকি’ কাণ্ডে মোটর-যান মালিকদের দুর্দশার সীমা-পরিসীমা ছিল না। দুর্ভোগ-জ্বালা-যন্ত্রণা তো ছিল ‘আকাশ-ছোঁয়া’ তার ওপর সেটা হয়ে উঠেছিল টাকা-পয়সা লুটতরাজের এক মহা আস্তানা। বিআরটিএর কাউন্টারে জমা দেওয়া ট্যাক্স, টোকেন, ফিটনেস ও অন্যান্য ফি-এর টাকা বেমালুম গায়েব হয়ে যেত। পরবর্তীতে ঐ অফিস থেকে দাবী করা হয়, গাড়ীর টাকা কাউন্টারে নয়, বাইরে জমা দেওয়া হয়েছে। যাহোক, ঐভাবে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হলেও অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোন শাস্তি হয়নি।
মন্দের ভালো এখন আপাতদৃষ্টিতে টাকা লুটপাটের সেই রমরমা ব্যবসা আর নেই। মানুষের দুর্ভোগের মাত্রাও এখন অনেকখানি কমেছে। সে দিক থেকে কর্তৃপক্ষ প্রশংসা পেতেই পারেন। কিন্তু দুর্ভোগ যে একেবারে বন্ধ হয়েছে তা বলার উপায় নেই। দুর্ভোগ এখনো আছে। কর্তৃপক্ষ ইচ্ছে করলেই সমস্যা অনেকখানি কমিয়ে আনতে পারেন। কিন্তু, তাদের ইচ্ছেটা জাগছে না। অবস্থা বিবেচনায় একথা বলা যায় যে, ‘সমস্যা অনেক কমানো হয়েছে’, আরো কমালে থাকবে কি? তার চেয়ে রেলগাড়ি যেমনভাবে চলছে, চলুক না! মানুষকে বেশি স্বস্তি দিলে আবার যদি তারা মাথায় উঠে বসে?
বিআরটিএ জনভোগান্তি কমাতে প্রধান যে কাজটি করেছিল তা হচ্ছে টাকা জমা দেওয়ার ব্যবস্থাটি মহানগরীর সমস্ত স্থানে ছড়িয়ে দেয়া। এতে  করে মোটরযান মালিক ও চালকদের সহজেই নিজ নিজ এলাকায় যাবতীয় ‘ফিস’ পরিশোধ করে শুধুমাত্র গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করানোর জন্য বিআরটিএতে যেতে হয়। কিছুৃদিন ভালোই চলছিল। কিন্তু, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকগুলোতে টাকা জমা দিতে আবারো হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। কোন ব্যাংক বলে ‘সার্ভার খারাপ’ কোন ব্যাংক বলে, স্টাফ কম, টাকা জমা নেওয়া যাবে না’ কোন ব্যাংক বলে, ‘নেটওয়ার্ক নেই’, কেউ বলে ‘সার্ভার মেরামতের কাজ চলছে’। আবার একাধিক ব্যাংক জানিয়ে দেয়, ‘৩০টির বেশি মোটর-যানের ফি একদিনে নেওয়া যাবে না’। ফলে আগের মতো মানুষ দুর্ভোগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে অনেকে আশংকা প্রকাশ করছেন। কারো কারো মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, বিআরটিএ ব্যাংকগুলোকে যে কমিশন দেয় তা কি অপ্রতুল? তা না হলে তারা কেন টাকা নিতে গড়িমসি করবে? ব্রাক ব্যাংক ‘বিআরটিএ’ অফিসের ভেতর ৮-১০টি বুথে টাকা জমা নিলে মহানগরীর অন্য শাখাগুলোতে কেন পর্যায়ক্রমে টাকা জমা নেওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে? বিষয়টি জরুরিভিত্তিতে পর্যালোচনা করে আরো বেশিসংখ্যক ব্যাংক শাখায় টাকা জমাদানের ব্যবস্থা করা দরকার বলে মোটরযান মালিকরা মনে করেন।
একজন মোটরযান মালিক অভিযোগ করে বলেন, তিনি গত মাসে তার গাড়ির ইঞ্জিন পরিবর্তনের কাগজপত্র জমা দিয়ে ‘রেকর্ড’ সংশোধনের জন্য মিরপুর বিআরটিএ অফিসে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে ঐ অফিসে গিয়ে সংশ্লিষ্ট মোটরযান পরিদর্শকের কক্ষে গিয়ে কাগজপত্র জমা দিতে গেলে একজন ‘আনসার সদস্য’ কক্ষের দরোজা একটুখানি ফাঁক করে বলেন, এখন লাঞ্চ পিরিয়ড। আধঘণ্টা পর আবার দরজায় টোকা দিয়ে লাঞ্চ শেষ হয়েছে কী না জানতে চাইলে পাশের দেয়ালে সেঁটে রাখা একটি ‘সময়সূচী’ দেখিয়ে ঐ ‘আনসার সদস্য’ বলেন, স্যার বোধহয় ২টায় বের হবেন। এতো দীর্ঘ সময় ‘লাঞ্চ বিরতি’ কেন জানতে চাইলে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। ঐ কক্ষে উঁকি-ঝুঁকি মারা আরো ৬-৭ জন সেবা-গ্রহীতা এ পর্যায়ে ঐ মোটরযান মালিককে বলেন, ‘পরিদর্শক সাহেব’ নাকি এসির বাতাস খাচ্ছেন। তাই ‘আনসার সদস্য’ বার বার দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। তিনি সোয়া ২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। দরোজা ধাক্কালে অফিসার সাহেবরা বিরক্ত হন।’ 
অভিযোগকারী মোটরযান মালিক একটু সচেতন প্রকৃতির মানুষ। তিনি আর অপেক্ষা না করে সোজা চলে গেলেন মেইন গেটের পাশে দোতলায় অবস্থিত উপ-পরিচালকের কক্ষে। তাঁকে বিষয়টা জানালে এবং মোবাইল ফোনে তোলা ‘সময়সূচি’ প্রদর্শন করলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিদর্শককে মোবাইল ফোনে কঠিন ভাষায় বকাঝকা করেন। বলেন, ‘যান ওই পরিদর্শককে আমাকে ফোন করতে বলেন’। মোটরযান মালিক ফিরে গেলেন বটে, কিন্তু ‘এক্সপোজ’ হওয়ার ভয়ে তিনি আর পরিদর্শকের কক্ষে না গিয়ে অন্যদের সাথে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কারণ অভিযোগ করার কারণে খারাপ রিপোর্ট দিলে তখন তাকে বেকায়দায় পড়তে হতে পারে।
উপ-পরিচালকের বকুনি খাওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট পরিদর্শক তার প্রণীত ‘টাইম টেবিল’ অনুযায়ী তার কক্ষ থেকে বের হলেন এবং গাড়ি পরীক্ষা করলেন। ঐদিন যাই করুক, পরবর্তীতেও একই কায়দায় কার্য সম্পাদন করছেন কী না, এবং উপ-পরিচালক তার ‘নির্দেশনা’ সংশ্লিষ্ট উপ-পরিচালক মেনে চলছেন কী না সেটা যাচাই করেছেন কী না, তা আর জানা যায়নি।
গাড়ি পরীক্ষার পর কাগজপত্র নিয়ে ঐ মোটরযান মালিক এবার কামরায় কামরায় ছুটতে লাগলেন। গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর অনুযায়ী নাকি কর্মচারিদের ভাগ করে দেয়া আছে। টেবিলের কাঁচের নিচে রাখা তালিকা দেখে একজন বললেন, ‘অমুক নম্বর কক্ষে যান।’ সেখানে গেলে তিনি বলেন, ‘ভুল কক্ষে এসেছেন। আপনি বরং অমুক নম্বর কক্ষে যান।’ এই সামান্য বিষয়টা যে সহজ সমাধান আছে তা বিআরটিএ কর্মকর্তাদের মাথায় আসে না। তারা অতি সহজেই নম্বর বিন্যাস অনুযায়ী তালিকা তৈরি করে কর্মচারিদের কক্ষগুলোর দরজায় সেঁটে দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করতে পারেন। এতে গাড়ি মালিক নিজেরাই নিজেদের রেজিস্ট্রেশন খুঁজে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের কাছে জমা দিতে পারেন। কেন যে সেটা হচ্ছে না- তা বোঝা মুশকিল।
এতো গেল একটা দিক। অন্যদিকে, ইঞ্জিন বা গাড়ীর মালিকানা বদলির জন্য কি কি ‘ডক্যুমেন্ট’ জমা দিতে হয় এবং এর জন্য ফি-এর পরিমাণ কত সেটাও বিভিন্ন (সংশ্লিষ্ট) কক্ষের প্রবেশ-মুখে লাগিয়ে রাখলে সেবা গ্রহীতার যে সুবিধা হয় তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা করতে রাজি নন। কারণ, তাদের বক্তব্য হচ্ছে, বিআরটিএ’র মূল গেটে নাকি ঐ নির্র্দেশনা বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে। একজন গাড়ি-মালিক সংশ্লিষ্ট সহকারী পরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, গেটে যে নির্দেশনা দেয়া আছে তা পাকিস্তান আমলের। তার পরেও ‘সেবাকক্ষে’ হালনাগাদ নির্দেশনা দিলে ভালো হয় জানালে তাতেও সহকারী পরিচালক একমত হতে পারেননি। অন্য একজন সহকারী পরিচালক বিআরটিএ-এর ওয়েবসাইটে সব নিয়ম-কানুন দেয়া আছে বলে জানালেও তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেবা-প্রার্থীদের পরামর্শ গ্রহণে বিআরটিএ-এর অধিকাংশ কর্মকর্তাই অনীহা প্রকাশ করেন। তাদের মনোভাব এতই আমলাতান্ত্রিক যে, ভালো পরামর্শ শুনতেও তারা বিরক্তি প্রকাশ করেন। অধিক বিজ্ঞজনেরা সাধারণতঃ এমন করে থাকেন বলে সমালোচকরা বলে থাকেন।
একটি বেসরকারী কোম্পানীতে কর্মরত একজন উর্ধতন কর্মকর্তা তার ড্রাইভিং লাইসেন্স ‘ডিজিটালাইজড’ করার জন্য যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন তা বর্ণনা করেছেন এ লেখকের কাছে। মাস কয়েক আগে এক কর্মদিবসে মিরপুর বিআর টিএ অফিসে হাজির হয়ে তার আক্কেল গুড়–ম হওয়ার দশা। সংশ্লিষ্ট সহকারী পরিচালক (এডি, প্রকৌশল) নাকি সকালেই তাদের প্রধান কার্যালয়ে গেছেন জরুরি সভায় অংশ নিতে। একাধিক এডি থাকা সত্ত্বেও কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যাওয়ার ‘সিস্টেম’ নাকি গড়ে উঠেনি সেখানে। ফলে অসংখ্য সেবাগ্রহীতা ফিরে গেলেও ডজনখানেক সেবাগ্রহীতা তার কক্ষে অপেক্ষা করেছেন কয়েক ঘণ্টা ধরে। ভদ্রলোক বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে অন্য একজন এডি’র কক্ষে ঢুকে পড়লেন। কাউকে দায়িত্ব দিয়ে না যাওয়ার প্রসঙ্গ উত্থাপন করে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। বললেন, অন্য কোন সংস্থা বা অফিস হলে এটা ‘অগত্যা মধুসূদন’ হিসেবে মেনে নেয়া যায়। কিন্তু বিআরটিএর মতো ব্যস্ত প্রতিষ্ঠানে যেখানে দৈনিক কয়েক হাজার সেবা প্রার্থীকে কোন না কোন কাজে সহকারী পরিচালকের শরণাপন্ন হতে হয়, সেখানে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা অনুপস্থিত থাকবেন, এটা হতে পারে না।
যাহোক, অন্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও ঐ সহকারী পরিচালক উক্ত সেবা গ্রহীতার আবেদনপত্রে লিখে দিলেন, ‘ব্যবস্থা নিন’। এবার ঐ আবেদনপত্রসহ ভদ্রলোক সংশ্লিষ্ট অধঃস্তন কর্মচারীর কাছে কাগজপত্র জমা দিলেন। ঐ কর্মচারী তা ফাইলে রেখে দিয়ে পরের দিন আসতে বললেন। বলা হলো মূল ‘এডি স্যার’ ছাড়া কাজটি আর এগুবে না। বাধ্য হয়ে ভদ্রলোক সেদিন ফিরে এলেন। তিনি আশা করেছিলেন, বিকেলে সংশ্লিষ্ট এডি ফিরে এলে উক্ত কর্মচারী ফাইলটি স্বাক্ষর করিয়ে রাখবেন।
কিন্তু বিআরটিএ-তে অতো দায়িত্বশীল কর্মচারী থাকলে কি আর লোকজন একবাক্যে সর্বদাই ‘ছিঃ ছিঃ’ বলতেন? সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীও আলোচ্য সংস্থার ওপর ক্ষুব্ধ। যাহোক, পরদিন সকাল ১১টায় গিয়ে দেখা গেল শুধু ঐ ভদ্রলোকের ফাইলটিই নয়, আরো ১৪/১৫টি ফাইল যে অবস্থায় ছিল তেমনি সাজিয়ে রাখা আছে। বিলম্ব না করে ফাইলগুলো এডির চেম্বারে পাঠিয়ে দেওয়ার অনুরোধের পর কর্মচারী পিয়ন খুঁজতে লাগলেন। দীর্ঘসময় পর একজনকে পাওয়া গেল। কি অবাক ব্যাপার, ১৪/১৫টি ফাইলের মধ্যে শুধু ঐ ভদ্রলোকের ফাইলটি পিয়নের হাতে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে আনলেন। তারপর একগুচ্ছ কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলা হলো, ‘ছবি তোলা’ এবং ‘ফিঙ্গার প্রিন্ট’ দেয়ার জন্য ২০ নম্বর কাউন্টারে যেতে হবে। সেখানে কাগজপত্র জমা দিয়ে প্রায় দু’ঘণ্টা ঘোরাঘুরির পর ‘ছবি তোলা’ এবং ‘ফিঙ্গার প্রিন্ট’ দেয়ার কাজটি সম্পন্ন হলো। ২ মাসের একটা লম্বা তারিখ দিয়ে বলা হলো, তারিখ অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হবে। ভদ্রলোকের আক্কেল গুড়–ম হবার যোগাড় আর একবার। তিনি সামনের সপ্তাহে পিএইচডি করতে তিন বছরের জন্য স্ত্রী-সন্তান, পোটলা-পুঁটলি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার হাওয়াই জাহাজে উঠবেন।
এখন প্রশ্ন হলো: ভদ্রলোকের তদ্বিরের কারণে তো ফাইলটি এগোলো। আর বাকি ফাইলগুলো? সেগুলো কি লাভবান হওয়ার জন্যই আটকে রাখা হলো? এটাই কি স্বাভাবিক পন্থা? কি জবাব দেবেন বিআরটিএ?
লেখক: কলামিস্ট


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি