ঢাকা, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭  ,
১৯:৪৪:২০ জুন  ২২, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


পাহাড়ধসে আর কত প্রাণ যাবে

Image

সাঈদ সাহেদুল ইসলাম
লেখক: কলামিস্ট

ভারী বর্ষণ এখনো শেষ হয়ে যায়নি, আরো বর্ষণ হবে। তাহলে কি আবারও পাহাড়ধস ঘটবে? আবারও অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটবে? এ পাহাড়ধসের কারণটা একটু জানা দরকার। চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচটি জেলা- রাঙামাটি, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি এখন লাশের শহর। পাহাড়ধসে মানুষ মরেছে প্রায় শ’ দেড়েক। নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে। তার মানে মৃতের সংখ্যা বাড়বে এমন আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। উদ্ধার-কাজে নিয়োজিত কয়েকজন সেনাসদস্যও নিহত হয়েছেন।
পাহাড় সে তো প্রকৃতির শোভা। প্রাকৃতিক নিয়মেই যেখানে পাহাড় থাকার সেখানে থাকবে। পৃথিবীর মোট আয়তনের একটা বড় অংশ পাহাড়-পর্বত। বিশ্বের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের একটি বিরাট অংশ পাহাড়-পর্বতকে ঘিরেই আবর্তিত। পাহাড়-পর্বত সুপেয় ঝরনা-ধারার প্রকৃষ্ট আধার। পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ এই পাহাড় থেকেই সুপেয় জল পায়। পাহাড় তো বিশ্ব পরিবেশ ও আবহাওয়ার প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। তাই বলা যায় পাহাড়-পর্বত হচ্ছে বৈশ্বিক অলঙ্কার। তাছাড়া বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২% মানুষ এই বৈশ্বিক অলঙ্কার পর্বতে বসবাস করে। কিন্তু মানুষ এই অলঙ্কারের প্রতি আদৌ শান্ত প্রকৃতির আচরণ করছে না।
বাংলাদেশে যে সমস্ত জেলায় পাহাড় রয়েছে তা মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। পাহাড়ের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশে পাহাড়ধস হচ্ছে এবং পাহাড়ধসে অনেক প্রাণহানি ঘটছে। বাংলাদেশের পাহাড়ি জেলাগুলোয় বিভিন্ন উপজাতি বসবাস করে। যারা বাস করে তাদের জন্ম-মৃত্যু হয়তো বা পাহাড়েই। তারা পাহাড় চেনেন, পাহাড়ের আচরণ জানেন। এখন তাদের সাথে যোগ হয়েছে কিছু অর্থলোভী পাহাড়খেকো মানুষ, যারা প্রাকৃতিক নিয়মের তোয়াক্কা না করেই পাহাড় কেটে মানুষের সর্বনাশ ডেকে আনছে। প্রাকৃতিকভাবে কোনো পাহাড় সহজে ভেঙে যাওয়ার নমুনা খুব কম। কিন্তু মানুষ যখন পাহাড় কেটে, পাহাড়ের অঙ্গহানি করে সেখানে বসবাস করছে ঠিক তখনি ঘটছে এমন বিপর্যয়।
পাহাড় কাটার মূল কারণ মানুষের লোভ। কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করে তা ভাড়া দিচ্ছে অর্থের লোভে। অবৈধভাবে পাহাড়ে গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সংযোগও দেয়া হচ্ছে। সৃষ্টিকর্তা পাহাড় সৃষ্টি করেছেন প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য, বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্যের জন্য। পাহাড়-পর্বত, গাছপালা, মানুষ, প্রাণী, পশুপাখি, জীব-জড়- সবকিছুর মাধ্যমে যেমন বাস্তুসংস্থান পদ্ধতির ভারসাম্য রক্ষা হয়, তেমনি শুধুমাত্র পাহাড় তার অবস্থানের মাধ্যমে বাস্তুসংস্থান পদ্ধতি বজায় রাখে। আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে সবকিছু মিলেই তো আমাদের পরিবেশ। সবকিছু মিলে একটি শিকলের মধ্যে বাঁধা। আর সেই শিকলের একটি অংশ খুলে নিলেই যেমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তেমনি পাহাড়ও। তার অবস্থানের ভিত্তিতে তার কোনো একটি অংশকে কেটে-ছেঁটে ফেললে তার আর বাস্তুসংস্থান পদ্ধতি ঠিক থাকে না। দিন দিন বিজ্ঞান উন্নত হচ্ছে, কিন্তু এই বিষয়টি কি আজও কোনো পাহাড়খেকোদের বোঝানো সম্ভব হয়নি?
খবরে পড়েছি, পাহাড়ধস প্রতিরোধ কমিটি রয়েছে। পাহাড়ধস প্রতিরোধ কমিটি থাকলে তো পাহাড়ধস হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তাদের কাজ কী? আমার বোধ হয়- তারা পর্যবেক্ষণ করবেন- কারা অবৈধভাবে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করে ভাড়া দিচ্ছে, কারা কীভাবে বসবাস করছেন? ভারী বর্ষণের সময়, যারা পাহাড়ে বসবাস করছেন, তাদের নিরাপত্তা কতটুকু- এমন বিষয়গুলো সেখানে প্রাধান্য পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে কি তার প্রয়োগ হচ্ছে? কমিটি কি সচেতনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন? নাকি পাহাড়ধস প্রতিরোধ কমিটি খাতায়-কলমে একটি পূর্ণাঙ্গ-মার্জিত কমিটি হিসেবে রয়েছে গেছে- সেটা ভাববার বিষয়। সম্প্রতি ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। মারা গেছে দেড় শতাধিক। যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের স্বজনদের চোখের পানির মূল্য কেউ দিতে পারবেন না জানি, তবে আর যাতে পাহাড়ধসে জীবনের হানি না ঘটে সেদিকে কি খেয়াল করা যায় না? অতিবর্ষণের কারণে পাহাড়ধস। আর পাহাড়ধসের কারণে মানুষের প্রাণহানির সাথে সাথে সড়ক তলিয়ে যাওয়া, বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, অনেক বাড়িঘর নষ্ট হয়ে যাওয়া- সবমিলে স্বার্থান্বেষী কিছু লোভী মানুষ পাহাড় কেটে বসতি বানিয়ে ভাড়া দিয়ে যে আয় করছে সে আয়ের চেয়ে রাষ্ট্রের ক্ষতির পরিমাণটাই বেশি নয় কি? আবারও বলি, যা প্রতিরোধ করা যায়, তা প্রতিকারের চেয়ে অনেক ভালো। তাই আর যেন পাহাড়ধসে এভাবে প্রাণের হানি না ঘটে সে দিকে নজর দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে, সবাইকে। আর পাহাড় কেটে যারা প্রাণের হানি ঘটাচ্ছে তাদের শাস্তির বিধান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি