ঢাকা, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭  ,
১৯:৪২:১১ জুন  ২২, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


প্রচণ্ড গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ গ্রাম-গঞ্জে মানুষের হালচাল

Image

অরুণ ব্যানার্জী
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

প্রচণ্ড গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ। বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক।  পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের তৎপরতায় দেশের বহু গ্রামে ৫ ঘন্টার বেশি বিদ্যুৎ ছিল না। শহরগুলোতে বিদ্যুৎ থাকতো ১০ থেকে ১২ ঘন্টা পর্যন্ত। ওই অবস্থায় খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, নিুবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনে উঠেছিল নাভিশ্বাস। পবিত্র রমজান মাস আসার সাথে সাথে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কিঞ্চিৎ পরিবর্তন এসেছে। তাই বলে গরমের প্রকোপ  কমেনি। এতে করে হিট স্ট্রোকে মানুষ যেমন মারা যাচ্ছে, তেমনি হচ্ছে অসুস্থ। কিন্তু দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা সদর সরকারি হাসপাতালে ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থা সন্তোষজনক নয়। এই অবস্থায় প্রকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে টিকে থাকার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ।
বগুড়া জেলার কাহালু উপজেলার যোগিরভবন আতালপাড়া একটি গ্রামের নাম। গ্রামটি তালপাখার গ্রাম হিসেবে জেলায় ও জেলার বাইরে পরিচিতি পেয়েছে। এ গ্রামের চারশ’র বেশি পরিবার তালপাখা তৈরির সাথে জড়িত। এ কারণেই যোগিরভবন আতালপাড়ার গ্রাম জুড়ে মেঠোপথের দুপাশে সারি সারি তালগাছ রয়েছে। এই তালগাছকে কেন্দ্র করেই মানুষের ব্যস্ততা এখন বেড়ে গেছে  কয়েকগুণ। চলবে অন্তত ভাদ্রমাস পর্যন্ত। যাদের বৈদ্যুতিক পাখা ব্যবহারের মতো আর্থিক সঙ্গতি নেই, প্রচণ্ড গরমে তাদের তালপাখা চাই-ই। তালপাতার সব ধরনের হাতপাখা তৈরি করেন কাহালু উপজেলার পাইকড় ইউনিয়নের তিন গ্রামের মানুষ। পুরুষরা সংসারের হাল ধরেন আর নারীরা গৃহস্থালীর কাজের পাশাপাশি তালপাখা তৈরি করেন। এতে বাড়ছে তাদের সংসারের আয়। এক সময় তিন গ্রামের মানুষ দিন মজুর খেটে হিমশিম খেতেন সংসার চালাতে। এখন হাতপাখা তৈরি করে সন্তান সন্ততি নিয়ে তারা দুধে ভাতে দিন কাটাচ্ছেন। যোগিরভবন গ্রামের ৭৫ বয়সের  বৃদ্ধ আমান আলী। বয়সের ভারে এখন ঠিক মতো চলাফেরা করতে পারেন না। তিনি জানান তার জšে§র আগে থেকে বাপ-দাদার ব্যবসা ছিল এই তালপাখা। সেই হিসেবে এই গ্রামে তালপাখা তৈরির ইতিহাস একশ বছরেরও বেশি। গ্রামের বাসিন্দাদের মুল ব্যবসাই এখন তালপাখা তৈরি। সবাই তালপাখা তৈরিতে প্রশিক্ষিত। আমান আলীর স্ত্রী অভিরন, বয়স প্রায় ৬৫ বছর। বয়সের তুলনায় বৃদ্ধ হয়ে গেছেন বেশি। চোখে ভালো দেখেন না। তিনিও অনুমানের ওপর  তালপাখা বানিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানালেন, এখন আর চোখে ভালো দেখতে পারেন না। অনুমান করেই তৈরি করে ফেলতে পারেন হাত পাখা। দিনে তিনি এরকম ২৫-৩০টি হাতপাখা তৈরি করতে পারেন। তালপাখা গ্রামের জয়নাল আবেদীন মিয়ার মতে তালগাছ থেকে পাতা কেটে বিশেষ কায়দায় তার দিয়ে বাঁকিয়ে পাখা তৈরি করে শুকানো হয়। এরপর রং করে  আকর্ষণীয় করে তোলা হয়। এখানে মাঘ মাস থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত পাঁচ ধরনের পাখা তৈরি করা হয়। এখানকার প্রস্তুতকৃত বিশেষ ধরনের ডাটি ঘুরকি, পকেট, হরতন বেতিশাখা প্রতি হাজার ২-৩ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। এছাড়া সাধারণ মানের পাখা বিক্রি হয় প্রতিশত ৩০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকায়। খুচরা বাজারে এটাই ১০-১২ টাকায় বিক্রি হয়।
গাইবান্ধা জেলার সাদুল্যাপুর উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিম দিকে অবস্থিত রসুলপুর ইউনিয়নের আরজি ছান্দিয়াপুর ও জামালপুর ইউনিয়নের বুজরুক রসুনপুর গ্রাম। ঐ দুই গ্রামের দুই শতাধিক পরিবারের শতকরা ৮০ ভাগ নারী পুরুষ অন্তত দুই দশক ধরে সুতার তৈরি রঙ বেরঙের বিভিন্ন ডিজাইনের হাতপাখা তৈরি করে আসছেন। ঐ দুই গ্রামের সমন্বয়ে এলাকার মানুষ গ্রামদ্বয়ের নাম রেখেছেন খামারপাড়া ও পাখার গ্রাম। আরজি ছান্দিয়াপুর গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল খালেক জানান, গত ২০ বছর আগে প্রচণ্ড গরমে মানুষের জীবন যখন ওষ্ঠাগত ঠিক তখন প্রয়োজনের তাগিদে হাতপাখা তৈরি শুরু করে গ্রামের দুই একজন ব্যক্তি। পরে এসব পাখা দেখে নারীরা বাড়িতে গিয়ে হাতপাখা তৈরি শুরু করে। ধীরে ধীরে এসব গ্রামের প্রতিটা বাড়িতে আঙ্গিনা ও পিড়াতে বসে স্বামী-স্ত্রী  সন্তানদের নিয়ে পাখা তৈরি করছেন। আবার নারী-পুরুষরা দলগতভাবে আলাপ, হাসি ঠাট্টার মাধ্যমে কেউ সুতা গোছানো, কেউ বাঁশ কাটা, চাক তৈরি আবার কেউ সুই দিয়ে সেলাই ও রং বেরংয়ের ডিজাইন তৈরি করছেন। গ্রামের দুই শতাধিক পরিবারের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ পাখা তৈরির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত প্রচণ্ড গরমে মানুষ তালপাতার পাখার বাতাস খেয়ে স্বস্তিবোধ করছেন। নতুন করে তালগাছ লাগানোর প্রবণতা কম দেখা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সজাগ হতে হবে। তালগাছের চারা ব্যাপক ভিত্তিতে লাগালে বজ পাতের সম্ভাবনা যেমন কমবে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে। এছাড়া তালপাতার পাখা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে। কৃষি ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক বা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) তালপাতার পাখার কর্মীদের সহজ শর্তে ঋণ দিলে এ শিল্প টিকে থাকবে মানুষের প্রয়োজনে। এনজিও থেকে চড়া সুদে লোন নিয়ে এসব কর্মীদের ব্যবসা চালাতে হয় এমন অভিযোগ রয়েছে। এভাবে সরকারের সংশ্লিস্ট বিভাগের নীতি নির্ধারকদের দ্রুত এগিয়ে আসা জরুরি।
প্রচণ্ড গরমে সারাদেশে জনজীবন অতিষ্ঠ। এসময় ‘মাঠা’ বিশেষ অনুসঙ্গ হিসেবে কাজ করে থাকে। মাঠা দেশের বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয়। কিন্তু পাবনার বেড়া উপজেলার মাঠার স্বাদ ও গন্ধে পার্থক্য রয়েছে। মাঠার অপর নাম ‘ঘোল’। মাঠা তৈরি হয় গরুর দুধ থেকে। গরুর দুধ উৎপাদনে এ উপজেলায় রয়েছে বিশেষ সুনাম। বেড়া উপজেলার লোকজন মনে করেন দুধের কারণে এখানে ভালোমানের মাঠা তৈরি হয়। তবে মাঠা তৈরিতে কারিগরের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। প্রচণ্ড গরম ও ইফতারিতে মাঠা নামক পানীয় এই এলাকার মানুষের শরীর শীতল করে। তৃপ্তির পরশ  পান তারা। কেউ কেউ শরবত বানানোর জন্য মাঠায় পানি মেশান। এর সাথে দেন কাগুজি লেবু ও বরফকুচি। মাঠার স্বাদ ও বর্ণ পাবনার বেড়া উপজেলার নারী-পুরুষ ও শিশুদের সারা বছরই বিশেষ করে প্রচণ্ড গরমে মাঠা এনে দেয় তৃপ্তির পরশ। প্রচণ্ড গরমে সারা দেশে আম, জাম, কাঁঠাল, আনারস, লিচু ইত্যাদি খেয়ে থাকেন। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা, মেহেরপুরের আম স্বাদে গুনে অতুলনীয়। রাজশাহী, পাবনার ঈশ্বরদী, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার লিচু, ঠাকুরগাও ও চুয়াডাঙ্গার কাঁঠালের স্বাদ ও গুণগত মান গরম মোকাবিলায় অনন্য। অনেকে আম ও বেলের শরবত ছাড়াও বিভিন্ন রকম শরবত পান করে গরমের হাত থেকে রক্ষা পেতে সচেষ্ট হন।
জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে প্রচণ্ড গরমে মানিকগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তালের শাঁস। জেলার শিখালয় ঘিওর ও হারিরামপুর উপজেলার তালের শাঁস বেশি উৎপাদিত হয়। তালের শাঁস অতি সুস্বাদু হওয়ায় প্রচণ্ড গরমে শিশু কিশোর তরুণ থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার কাছে তালের শাস একটি জনপ্রিয় ফল, জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, মেলা বাসস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন অলিতে গলিতে অনেক হত দরিদ্র মানুষ তালের শাঁস বিক্রি করে এই মৌসুমে বেছে নিয়েছেন জীবিকার লাভজনক পথ। শিবালয় উপজেলার গৃহস্থদের তালের শাঁস যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায়। প্রচণ্ড গরমে স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীসহ বিভিন্ন বয়সী লোকজনের মাঝে  তালের শাঁসের কদর দিন দিন বাড়ছে। তালের শাঁস শরীরের জন্য খুবই উপকারী। গরমের দিনে তালের শাঁসে থাকা জলীয় অংশ পানি শূন্যতা দূর করে। এছাড়া ক্যালয়িসাম, ভিটামিন এ বি ও সি রয়েছে। তালে রয়েছে এন্টি অক্সিডেন্ট. যা বাড়িয়ে দেয় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। কচি তালের শাঁস রক্তশূন্যতা দূর করে। চোখের দৃষ্টি শক্তি ও মুখের রুচি বাড়ায়।
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। কৃষির ওপর নির্ভর করে মানুষ যেমন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে, তেমনি ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগিয়ে বহু মানুষ  বেঁচে আছে। সারা দেশে ফলজ সম্পদ কম নেই। কিন্তু একে পরিকল্পিত উপায়ে ব্যবহারের তেমন কোন প্রচারণা নেই। বিশেষ করে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে গাছগাছালি লাগানোর উদ্যোগ যেমন নিতে পারে, তেমনি পারে প্রচারণার মাধ্যমে ঋতুভিত্তিক ফলের উপকারিতা সম্পর্কে জনসাধারণের সামনে তুলে ধরতে। তাহলে গরম, বর্ষা, ও শীত ঋতুতে মানুষ কি ধরনের দেশীয় ফল ব্যবহার করে শরীরে পুষ্টি সমৃদ্ধ করতে পারে তার দিক নির্দেশনা পেতে পারে। গরম প্রতিরোধে মানুষ হতে পারে আরো স্বাস্থ্য সচেতন।


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি