ঢাকা, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭  ,
১৯:৩৮:২৭ জুন  ২১, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


মাছ চাষ বদলে দিতে পারে দেশের চেহারা

Image

মো. ওসমান গনি
লেখক : কলামিস্ট

সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতিতে মাছ চাষ করলে পাল্টে যেতে পারে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা। আমাদের দেশের শিক্ষিত বেকার যুবসমাজ তাদের জীবনের বেকারত্বের গ্লানি মোছার জন্য এখন মাছ চাষের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। বর্তমানে যে হারে আমাদের দেশে মাছ চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে তা যদি চলমান রাখা যায়, অতি অল্প সময়ে আমাদের দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে বিরাট আকারের উন্নয়নমূলক পরিবর্তন আসতে পারে। মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন দেশের লক্ষাধিক মানুষ। আর মাছ চাষের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। বর্তমানে স্থানীয় বদ্ধ  জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। মাছের উৎপাদন বেড়েছে ১.৬ গুণ। দেশে প্রতিনিয়তই মাছ চাষের সম্প্রসারণ ঘটছে। তবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছের চাষাবাদে পিছিয়ে আছে দেশ। এক্ষেত্রে গুণগতমানের হ্যাচারির অপর্যাপ্ততা ও চাষের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করাকে দায়ী করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকোয়াকালচার-২০১৬’ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ফিশারিজ পদ্ধতিতে মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের  অবস্থান চতুর্থ। মৎস্য অধিদফতরের তথ্যমতে, দেশের প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষ  কোনো না কোনোভাবে মৎস্য চাষ ও মৎস্য সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ নারী মৎস্য খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়োজিত। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বিগত ৭ বছরে মৎস্য খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অতিরিক্ত প্রায় ৬ লক্ষাধিক প্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে বদ্ধ জলাশয়ের পরিমাণ ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৩৬১ হেক্টর। উন্মুক্ত জলাশয়ের পরিমাণ ৩৯ লাখ ৬ হাজার ৪৩৪ হেক্টর।  দেশে মোট হ্যাচারির সংখ্যা ৯৪৬। এর মধ্যে সরকারি মৎস্যবীজ উৎপাদন খামারের সংখ্যা ১৩৬। আর বেসরকারি মৎস্য হ্যাচারির সংখ্যা ৮৬৮। মোট ফিশারির সংখ্যা জানা না গেলেও  মৎস্য অধিদফতর ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের দাবি, দেশে দিনদিন বাড়ছে ফিশারির  সংখ্যা।
মৎস্য অধিদফতরের ২০১৪-১৫ সালের তথ্যমতে, দেশে মৎস্য চাষির সংখ্যা ১ কোটি ৪৬ লাখ ৯৭ হাজার। বিভিন্ন  পেশায় নিয়োজিত থেকেও অনেকেই এগিয়ে এসেছেন মাছ চাষে। চাষির সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মাছের উৎপাদন। ২০০৮-০৯ সালে ২৭ দশমিক শূন্য ১ লাখ মেট্রিক টন মাছের উৎপাদন হলেও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ দশমিক ৮৪ লাখ মেট্রিক টনে। আর সরকারের টার্গেট ২০২১ সালের মধ্যে তা ৪৫ দশমিক ৫২ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীতকরণের।
বর্তমানে আমাদের দেশে বাজারে যেসব মাছ পাওয়া যায় তার অধিকাংশই চাষের মাছ। নিঃসন্দেহে বলা যায়, দেশে মাছ চাষের সম্প্রসারণ ঘটেছে। মাছ চাষের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনেকটা সম্প্রসারিত হলেও সব সময় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। সামগ্রিকভাবে দেশে মাছ উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ফিশারিজে  মাছের উৎপাদন কমেছে, বেড়েছে এ্যাকোয়াকালচারে। সাদা মাছ চাষের মাধ্যমে মাছের উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম।
হাওড় ও পাহাড়ের জেলা হবিগঞ্জেও মাছ চাষের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। শিকারিদের হাত থেকে প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছ রক্ষার্থে মাছের অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে কাজ করছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। জনসাধারণকে দেয়া হচ্ছে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ। মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে বরিশালের অজস  পরিবার। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও দিন দিন স্বাবলম্বী হওয়া পরিবারের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। ওই জেলার আগৈলঝাড়ায় ডিম থেকে পোনা মাছ উৎপাদন ও বিক্রি করেই স্বাবলম্বী হয়েছে অন্তত পাঁচ শতাধিক পরিবার। একইভাবে ঝিনাইদহে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে ৪৩ জন নারী। জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বলকান্দার গ্রামে শিরীষকাঠ  খালে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে তারা হয়েছেন সফল।
মাছ চাষে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার মাছ চাষিরাও। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে নানা কৌশল অবলম্বন করে বেকারত্ব মোচনের পাশাপাশি অধিক লাভবান হচ্ছেন তারা। দেলদুয়ার আটিয়া ইউনিয়নের আটিয়া গ্রামে পাঙ্গাশের চাষ হচ্ছে ব্যাপকভাবে। গ্রামের চারপাশে ছোট-বড় প্রায় দুই শতাধিক পুকুর। চাষিও প্রায় দেড় শতাধিক। অনেকেই হয়েছেন স্বাবলম্বী। সর্বোপরি এভাবেই সারাদেশে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে লক্ষাধিক মানুষ। মাছ চাষ ও মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে অনন্য অবদানের জন্য ২০১৬ সালে জাতীয় মৎস্য পুরস্কার পেয়েছেন ২০ জন। এরমধ্যে স্বর্ণপদক পেয়েছেন ৫ জন, আর রৌপ্যপদক পেয়েছেন ১৫ জন।
মাছ চাষের নতুন প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে  নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা। অবলুপ্ত মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করাই হল তাদের মূল কাজ। অনেক সময় দেখা যায়, টাকা আছে কিন্তু নির্দিষ্ট মাছ পাওয়া যাচ্ছে না; সেসব মাছের উৎপাদন যাতে বৃদ্ধি পায়, কৃষক যাতে সেসব মাছ ক্রয়ে আগ্রহী হয়, সে লক্ষ্যে নানাভাবে জনসাধারণকে সচেতন করে তুলছে তারা।
চিংড়ি চাষেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসেছে ব্যাপক সাফল্য। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় বাড়ির পুকুরে অন্যান্য মাছের সঙ্গে গলদা চিংড়ি চাষ করে সফল হয়েছেন মধু মিয়া। অর্জন করে নিয়েছেন সফল চাষি পদক। একইভাবে খুলনায় সফল হয়েছেন সুজিত মন্ডল। ১০ বছর ধরে তিনি ঘেরে চিংড়ি চাষ করে আসছেন। বর্তমানে চাষ করছেন আধুনিক পদ্ধতিতে। পূর্বের তুলনায় যেমন তার উৎপাদন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে মুনাফাও। জানা গেছে, সাতক্ষীরা ও পঞ্চগড় এলাকায়ও চিংড়ি চাষে এসেছে ঈর্ষণীয় সাফল্য।
মাছ চাষে যোগাযোগ ব্যবস্থাই প্রধান হাতিয়ার। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাসম্পন্ন এলাকায় মাছ চাষের সম্প্রসারণ ঘটে না। এছাড়া গুণগত মানের হ্যাচারির অভাব, মাছের খাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণই মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। এছাড়া মাছ বিক্রিতে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। মাছ চাষিদের সরকারের কাছে দাবি, মাছ চাষকে জনপ্রিয় করে তুলতে বিদ্যুত প্রাপ্তি যেন সহজলভ্য করে দেওয়া হয়। দেশে গুণগত মানের হ্যাচারির অভাব রয়েছে। ফলে মাছ চাষিদের পক্ষে অনেক সময় মানসম্পন্ন মাছের পোনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। এছাড়া মাছের খাদ্যের মূল্যের উর্ধগতি, কারেন্ট জালের ব্যবহার ও বিভিন্ন জলাশয় ভরাটের কারণে কোনো কোনো অঞ্চলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।
তৃণমূল পর্যায়ে মৎস্য চাষ সম্প্রসারণ কাজে নিয়োজিত জনবল যথেষ্ট নয়। বিজ্ঞানভিত্তিক মাছ চাষ এগিয়ে নেয়ার জন্যও জনবল অত্যন্ত কম। মাছের খাদ্য বা খাদ্য উপকরণ পরীক্ষার জন্য মৎস্য অধিদফতরের কোনো পরীক্ষাগার নেই।  মাছের খাদ্যের দাম বেড়ে চলেছে। কৃষিক্ষেত্রে সরকার ভর্তুকি দিলেও মাছের খাদ্যে কোনো ভর্তুকি দেয় না। এছাড়া মাছ চাষ বাণিজ্যিক খাত না কৃষির উপখাত তা নিয়েও সমস্যা রয়েছে। ফলে মাছ চাষিদের ঋণ প্রাপ্তিতেও দেখা দেয় নানা সমস্যা। স্বাভাবিক ভাবে খাল-বিল-নদী-নালায় পানি কমছে। সর্বত্র পানির গভীরতা হ্রাস পাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যত চিন্তা করে প্রাকৃতিক জলাশয় রক্ষা করতে হবে। চিংড়ি চাষে দেশ অনেক ভাল করছে। তবে একই সঙ্গে এর প্রভাবে লবণাক্ততাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। হ্যাচারির পানি যদি নদীতে ছেড়ে দেয় তাহলে  প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যতা বিনষ্ট হবে। সামগ্রিকভাবে মাছ চাষের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ও মাথায় রাখতে হবে।
মাছ চাষের মাধ্যমে দেশে অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাড়ছে রফতানি আয়। স্বাধীনতা পরবর্তী মৎস্য ও মৎস্যজাত দ্রব্য রফতানি করে আয় বেড়েছে বহুগুণ। তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ সালে মৎস্য ও মৎস্যজাত দ্রব্য রফতানি হয়েছে ৮৩ হাজার ৫২৫ মেট্রিক টন। আর বছরটিতে রফতানিকৃত দ্রব্যের অর্থমূল্য ছিল ৪৪৬ কোটি টাকা। শুধু রফতানি আয়ই নয়, মাছ চাষের মাধ্যমে দূর হচ্ছে বেকারত্ব। বহু শিক্ষিত যুবক মাছ চাষকে পেশা হিসেবেও গ্রহণ করেছেন। দেশে দিন দিন মাছ চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভবিষ্যতে তা আরও বৃদ্ধি পাবে। মাছ একদিকে যেমন আমিষের অভাব পূরণ করছে তেমনি মাছ চাষের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্ব দূর হয়েছে। অর্জিত হচ্ছে মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা, যা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে। মাছ চাষের সম্ভাবনা অবশ্যই ভালো বলতে হবে। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে থাকলে ভবিষ্যতে এ খাতে আরও সাফল্য আসবে।
মৎস্য অধিদফতরের  মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ-এর মতে, মাত্র ৭ বছরে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১০ লাখ টন, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। ফিশারিজেও বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ৬ এর কাছাকাছি। দেশে প্রায় ২৮ লাখ পুকুর আছে, যার মধ্যে মাত্র ১ শতাংশে বাণিজ্যিকভাবে মাছের চাষ হয়। বাকিগুলোতে প্রচলিত বা সনাতন পদ্ধতিতে মাছের চাষ হয়ে আসছে। সর্বোপরি মাছের উৎপাদনে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রসার ঘটছে ফিশারিজের।


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি