ঢাকা, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭  ,
১৯:৩৬:৩০ জুন  ২১, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


জলজট সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

Image

ডক্টর শেখ সালাহ্উদ্দিন আহ্মেদ
লেখক : কলামিস্ট

দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরীর অনেক এলাকায় দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। দুই মহানগরীর নিচু এলাকায় কোথাও জমেছে হাঁটুপানি, আবার কোথাও কোমরপানি। গত রবিবার রাত থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শুরু হওয়া বৃষ্টিপাত সোমবার পর্যন্ত গড়ায়। প্রবল বৃষ্টিপাতে রাজধানীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক তলিয়ে যায়। অন্যদিকে চট্টগ্রামের সিংহভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতার কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় রাজধানীতে। যানজট ও জলজটে নাকাল হয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মানুষও। যানজট ও জলজটের কারণে গত দুই দিন ঘরমুখো হাজার হাজার মানুষ কর্মস্থল থেকে সময়মতো বের হয়েও যানবাহনে ইফতার করতে বাধ্য হয়েছে। চটগ্রামে বৃষ্টি হলেই নেমে আসে জলাবদ্ধতার অভিশাপ। কর্ণফুলীতে জোয়ার এলেই প্লাবিত হয় নগরীর নিম্নাঞ্চল।
চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে এ পর্যন্ত বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কাঙ্খিত সুফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে কর্তাব্যক্তিদের দায়িত্বহীনতার কারণে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার জটিলতা হলো এর সঙ্গে রয়েছে জোয়ারের প্রভাব। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে লাগোয়া বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় চট্টগ্রাম মহানগরীর নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধার মুখে পড়েছে, যা জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। রাজধানীর বেশির ভাগ সড়ক যখন খোঁড়াখুঁড়ির শিকার সেই মুহূর্তে দুই দিনের ঘন বৃষ্টিপাত ঢাকা মহানগরীকে আরও অচল হওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ভয়াবহ জলজট-যানজটে পাঁচ মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করতে এক ঘণ্টাও কেটে গেছে। দেশের দুই বৃহত্তম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু সিটি করপোরেশন নয়, সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। সমস্যার সমাধানে নিতে হবে সমন্বিত পদক্ষেপ। রাজধানীজুড়ে যে রাস্তা কাটার মহোৎসব চলছে তাতে বর্ষা মৌসুমে জনভোগান্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বর্ষা হলে রাজধানীতে জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়া গত কয়েক বছরের অনিবার্য নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো এলাকা দিনের পর দিনও জলাবদ্ধ হয়ে থাকে। কেড়ে নেয় রাস্তাঘাটের আয়ু। বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার কারণে দেখা দেয় যানজট।
রাজধানীর জলাবদ্ধতা কমাতে নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সম্প্রসারণ, খাল সংস্কার, নর্দমা ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কারের কাজে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা সত্ত্বেও দৃষ্টিগ্রাহ্য কোনো সুফল অর্জিত হয়নি। বুধবারের দেড় ঘণ্টা বৃষ্টিতে রাজধানীর অনেক এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। যানজটের নগরীতে তা বাড়তি আপদ হয়ে দেখা দেয়। রাজধানীতে জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতো নগরায়ণের সব ক্ষেত্রে যে অব্যবস্থাপনার ছাপ রয়েছে, তার খেসারত দিতে হচ্ছে নগরবাসীকে। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাজধানীর জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। রাজধানীর পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহৃত হতো বেশ কিছু প্রাকৃতিক খাল। এসব খালের সিংহভাগই বেদখল এবং ভরাট হয়ে গেছে। অদ্ভুত এই দেশে সরকারি বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন খাল এমনকি নদীও বেদখল হয়ে যায়। সরকারের ভূমি দফতরের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে তা আত্মসাতের কৃতিত্ব দেখাচ্ছে একশ্রেণির খালখেকো লুটেরার দল। ফলে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয় রাজধানীতে। অচলাবস্থা সৃষ্টি হয় নগরজীবনে। নাগরিক ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। আমাদের মতে, রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার এবং দুই ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। বেদখলকৃত খালগুলো উদ্ধারে উদ্যোগ নিতে হবে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ ঘটিয়ে দ্রুত পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করতে হবে। এ কাজে জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগী ভূমিকাও কাম্য।
আরেকটি বিষয় হলো, প্রায় দুই কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত ঢাকা শহরে রাস্তার তুলনায় যানবাহন অনেক বেশি। সে কারণে যানজটও এই শহরে যন্ত্রণার নাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকা যেন এখন ঢাকা শহরের নিত্যদিনের বাস্তবতা। যানজট নিরসনে সরকারের প্রচেষ্টার কমতি নেই। গত সাত বছরে রাজধানীতে কয়েকটি উড়াল সড়ক ও ওভারপাসের কাজ শেষ হয়েছে। অনেক স্থানের ফুটপাথ দখলমুক্ত করা হয়েছে। নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের আংশিক খুলে দেয়া হয়েছে। চালু হয়েছে হাতিরঝিল প্রকল্পও। বাস্তবতা হলো এত কিছুর পরও যানজট কমেনি। গত পাঁচ বছরে রাজধানীতে বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি যানবাহন। পরিসংখ্যান মতে, প্রতিদিন গড়ে ৩১৭ নতুন যান নগরীর রাস্তায় নামছে। সব মিলিয়ে দিন দিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে নগরীর যানজট সমস্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যানজটের কারণে দিনে আর্থিক ক্ষতি ৩০০ কোটি টাকা। মাসে এর পরিমাণ দাঁড়ায় নয় হাজার কোটি টাকা। বিশ্বের অন্য কোন দেশে যানজটের জন্য এত বিপুল অর্থের অপচয় হয় না। শুধু তাই নয়, এ কারণে মহানগরীর ৭৩ ভাগ মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিও হচ্ছে। এসব বিবেচনায় দ্রুত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ না নিলে আগামীতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে বাধ্য।
রাজধানীতে ৩০ ধরনের যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলছে। রাজধানীতে সোয়া দুই লাখের স্থলে সাড়ে নয় লাখ গাড়ি চলাচল করছে। উল্টোপথে চলা ও আইন না মানা, কার পার্কিংয়ের স্থানে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, রাস্তা ও ফুটপাথ দখলের কারণে আট ভাগ সড়কের মধ্যে কার্যকর মাত্র আড়াই ভাগ। সিএনজি স্টেশন, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা না থাকা, ট্রাফিক পুলিশের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে যানজট হচ্ছে। এমনকি উন্নয়ন কাজ সময়মতো শেষ না হওয়াকেও যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়। আসলে রাজধানীর যানজটের মোক্ষম সময়টা উপনীত হয় মূলত অফিস সময়সূচীর শুরু এবং শেষটায়। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এই সময়সূচীটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই সময়টায় ব্যক্তিগত গাড়িরও ব্যবহার বেশি হয়ে থাকে। ফলে যানজট অনিবার্য। এই সময়টাকে সামনে রেখে যথাযথ কোন পদক্ষেপ নেয়া গেলে যানজটের যন্ত্রণা থেকে কিছুটা মুক্তি মিলবে বলে অনেকের ধারণা।
যানজটের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির নানা পন্থার কথা বলা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণে রাস্তার সংখ্যা বাড়াতে হবে। ঢাকার চারপাশে একটি চক্রাকার সড়ক নির্মাণ করতে হবে। ঢাকার ওপর মানুষের চাপ কমাতে আশপাশের শহরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ করে সরকারী অফিস আদালত শহর ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিতে হবে। আবাসিক এলাকা থেকে সকল প্রকারের বাণিজ্যিক স্থাপনা সরিয়ে নেয়া, এমনকি যানজট সমাধানে ট্রাফিক আইন মেনে চলা, ভিজিলেন্স টিম গঠন, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা, ইন্টার সেকশনের কাছে স্টপেজ বন্ধ করা, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাথ ও রাস্তা দখলমুক্ত করাসহ নানা পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কিছু কিছু পরামর্শ বাস্তবায়নও হয়েছে; কিন্তু বেশিদিন স্থায়ি হয়নি। এই বিষয়গুলোর প্রতি আবার যথাযথভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। রমজান ও ঈদ সামনে রেখে এখন থেকেই বাড়ছে যানজট। এই ব্যাপারে এখনই নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি