ঢাকা, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭  ,
১৯:৫৪:২৪ জুন  ২০, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


যাকাত নিতে গিয়ে মৃত্যু আর নয়

Image

মো. শরীফুর রহমান আদিল
লেখক: কলামিস্ট

যাকাত আদায়ের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হলো, যাকাতের সব টাকা একত্রিত করে যারা যাকাত পাওয়ার যোগ্য তাদের থেকে সর্বাধিক হকদারদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে নির্বাচন করে তাদেরকে পুনর্বাসন করা, যাতে তাদের ভবিষ্যতে নিজেদের চলার ব্যবস্থা হয় এবং পরবর্তীতে তাদের যেন যাকাত গ্রহণ করতে না হয়, বরং তাদের যেন যাকাত দেওয়ার সামর্থ্য হয়

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে যাকাত ৩য় স্তম্ভ। যাকাত ইসলাম ধর্মের গরিবদের প্রদেয় এক বিধান। যা একটি আর্থিক ফরজ ইবাদত। এটি হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত বান্দাহর সম্পদ বৃদ্ধি ও পবিত্র করার মাধ্যম এবং ধনী কর্তৃক বাধ্যতামূলকভাবে প্রদত্ত গরিবের অধিকার। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে শতকরা ২.৫% হারে যাকাত দিতে হয়।  আল্লাহ পবিত্র কোরআনের যেসব জায়গায়  নামাজ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন তার সাথে যাকাত আদায়ের কথাও বলেছেন  বলতে গেলে বলা যায়, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের ৮৮ জায়গায় যাকাতের কথা উল্লেখ করেছেন। এখান থেকেই বোঝা যায় যাকাত ও এটি আদায়ের গুরুত্ব কতখানি।  কিন্তু আমাদের দেশে যাকাত দেওয়ার নিয়ম এমন হয়ে যাচ্ছে যে, ঈদের সপ্তাহ খানেক আগে থেকে ঢাক-ডোল বাজিয়ে, মাইকিং করে যাকাত নেওয়ার জন্য জনসমাগম করানো হচ্ছে! আমাদের সমাজের  কিছু কিছু মানুষ যাকাতের উদ্দেশ্য না বুঝে এরকম একটি আর্থিক ইবাদতকে নিয়ে খেলা-তামাশায় পরিণত করছে  যা অত্যন্ত  পরিতাপের বিষয়। এসব ব্যক্তি কোনো হিসাব নিকাশ না করেই কিছু লুঙ্গি-শাড়ি কিনে মানুষের মাঝে চরম অব্যবস্থাপনার মধ্যে বিতরণ করে সে ওই এলাকার মাতব্বর সেজে যান। মনে হয় কোনো সমাজে কেউ নিজের মোড়লীপনা দেখাতে চাইলে এরকম লোক ডেকে শাড়ি লুঙ্গি দিলেই পরের দিন নিজেেেক ওই সমাজে মোড়ল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। আরেকটু স্পস্টভাবে বলতে গেলে বলা যায়, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য যাকাত আদায়কে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এভাবে যাকাত দেওয়ার  মধ্যে কোনো তাৎপর্য আছে বলে মনে হয় না।  বরং এভাবে মানুষকে ভিক্ষাবৃত্তির দিকে আরো উৎসাহিত করা হচ্ছে। অথচ যাকাত আদায়ের  উদ্দেশ্যই হলো - দারিদ্র্যদূরীকরণ। হযরত ওমর (রা.)-এর যুগে প্রথমবার যারা যাকাত গ্রহণ করেছে পরের বছর তারা যাকাত দিয়েছে।  আর এভাবে যদি যাকাত আদায় নিশ্চিত করা যায় তবে কোনো প্রকার ক্ষুদ্র্র্ঋণ ছাড়া সমাজ থেকে চিরতরে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশে সম্পদশালী লোকেরা প্রতিবছর যেভাবে যাকাত দেওয়ার প্রবণতা দেখিয়েছেন তাতে কি কারো দারিদ্র্য দূরীভূত হয়েছে বলে কেউ বলতে পারবে? নাকি এ প্রবণতার মাধ্যমে আমরা আরো বেশি দরিদ্রতার দিকে ঠেলে দিচ্ছি? এসব হীন মানসিকতার লোকদের অসুস্থ চিন্তা চেতনার জন্যই মার্কেটগুলোতে যাকাতের কাপড় পাওয়া যায় বলে সাইনবোর্ড লাগানো থাকে। আর যাকাতের কাপড়, লুঙ্গি, শাড়ি মানেই হলো একেবারে নিু ও সস্তামানের কাপড়। কিন্তু এভাবে যাকাতের টাকা দিয়ে শাড়ি লুঙ্গি কিনে তা বিলিয়ে দেওয়ার শিক্ষা কোথা থেকে পেল এই সমাজ? কোথা থেকে জানল কিছু নিুমানের শাড়ি-লুঙ্গি দিলেই যাকাত আদায় হয়ে যায়?
যাকাত আদায়ের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হলো, যাকাতের সব টাকা একত্রিত করে যারা যাকাত পাওয়ার যোগ্য তাদের থেকে সর্বাধিক হকদারদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে নির্বাচন করে তাদেরকে পুনর্বাসন করা, যাতে তাদের ভবিষ্যতে নিজেদের চলার ব্যবস্থা হয় এবং পরবর্তীতে তাদের যেন যাকাত গ্রহণ করতে না হয়, বরং তাদের যেন যাকাত দেওয়ার সামর্থ্য হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় কয়েকজন খাঁটি আলেমের সমন্বয়ে একটি করে কমিটি গঠন করে  ইসলামিক পন্থা অনুসরণ করে সর্বাধিক হকদারকে পুনর্বাসন করা যেতে পারে। এটিই হলো হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর শিখানো পন্থা।
কিন্তু সমাজের কিছু লোক মুহাম্মদ (সঃ)-এর নির্দেশিত পথে না গিয়ে সমাজকে করছে কলুষিত আর ইসলাম ধর্মকে করছে বিতর্কিত। সর্বোপরি দেশকে মধ্যম আয়ের যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে তাকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। এসব কাজের মধ্য দিয়ে ইসলামকে আজ বিশ্বে বিতর্কিত করা হচ্ছে, প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে ইসলামের যাকাত ব্যবস্থাকে, এরা সমাজের, দেশের, মানুষের, সভ্যতার সর্বোপরি ধর্মেরও শত্রু। যাদের কারণে পদদলিত হয়ে  প্রতিবছর মারা যাচ্ছে অসংখ্য নর-নারী। প্রতিবছর এধরনের ঘটনা ঘটলেই সবাই সহমর্মিতা জানিয়ে কিংবা কয়েকদিন এ বিষয়ে মুখভারী করলেই মনে হয় সবার দায়িত্ব শেষ। পরবর্তীতে এধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটার কোনো বাস্তব ও কার্যকরি উদ্যোগ এখনো পরিলক্ষিত হয়নি। যদি এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হতো তবে প্রতিবছর একই ঘটনা বারবার ঘটতো বলে মনে হয় না। অথচ প্রতিবারই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। যেমন- ২০১৫ সালে যাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে ময়মনসিংহে ২৭ জন নারী-শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ও কয়েকজনের আহত হওয়ায় পুরো দেশ তখন  শোকাহত ছিল। ১৯৮০ সালে ঢাকার জুরাইনে ১৩ জন, ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যাকাতের টাকা আনতে গিয়ে ৩ জন, ১৯৮৭ সালের ২৩ মে ঢাকার ক্যান্টমেন্ট এলাকা একই উদ্দেশ্যে গিয়ে মারা যায় ৪ জন, ১৯৮৯ সালের ৫ মে চাঁদপুরে ১৪ জন, ১৯৯০ সালে চট্টগ্রামের আবুল ফ্যাক্টরীতে  যাকাতের টাকা আনতে গিয়ে মারা যায় ৩৫ জন, ২০১৪ সালে মানিকগঞ্জ ও বরিশালে ৪ জনের মমৃান্তিক  মৃত্যু ঘটে।  গত ৩৫ বছরে যাকাতের শাড়ি-লুঙ্গি আনতে গিয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে ২৬১ জন মানুষকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন? কেন আমরা গরিবকে এভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি? এটা কি তার প্রতি কোনো করুণা নাকি অধিকার? যদি করুণা না হয়ে অধিকারই হয়ে থাকে তবে কেন আমরা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় এই অধিকার ও আমাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করছি না। আর যদি করুণাই হয়ে থাকে তবে ঈদের আগে কেন তাদের ডেকে নিয়ে এভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলাম? আর যাকাতকে গরীবের অধিকার না ভেবে আমরা করুণা ভাববো কেন? আমরা কী পারতাম না আমাদের কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী দিয়ে যারা যাকাত পাওয়ার হকদার তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের অধিকার বুঝিয়ে দিতে?  কেনইবা এভাবে পুরো উপজেলার সকলকে জড়ো করানো হচ্ছে? যাকাত পাওয়ার হকদার কারা? ইসলামের নির্দেশিত পন্থায় আমরা কী যাকাত দিতে পারছি? হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আমাদের কী যাকাত আদায়ের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা নির্দেশ করে যাননি? তবে কেন আমরা আজ সেই শিক্ষা থেকে দূরে? ডানহাতের দান বাম হাত না জানার কথা। তবে যাকাতের ক্ষেত্রে এতো ঢাকঢোল কেন? যাকাত তো কোনো দান বা সদকা নয়, বরং এটি একটি অধিকার। তবে দান সদকা থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থানকারী অধিকারকে আমরা এতো নিচে নামিয়ে দিচ্ছি কেন? কেন আল্লাহর নির্দেশিত গরিবের এই অধিকার আদায়ে এই চরম অবহেলা? এ পরিস্থিতির জন্য আমাদের আলেম সমাজের কিছুটা গাফিলতি আছে বলে মনে হয়। আলেম সমাজ অন্যান্য সবক্ষেত্রেই ফতোয়া জারি করতে পারে, কিন্তু এভাবে যাকাত দেওয়ার বিরুদ্ধে তাদের কোনো ফতোয়া নেই কেন? কেন এসব লোকদেখানো ও মানুষ মারার ফন্দিযুক্ত যাকাত আদায়কারীর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ মিছিল নেই? কেন এসব লোকদের সামাজিকভাবে বয়কট করার ঘোষণা আলেম সমাজ দেয় না? নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব হকদারের উপর সঠিকভাবে বন্টন না করে মানুষ হত্যার পরিণতি সম্পর্কে আলেম সমাজ কোনো বিবৃতি কিংবা প্রতিবাদ করে না কেন? আলেম সমাজ কেন এই বলে বিবৃতি দেয়না যে, যাকাত কেবল রমজান মাসেই নয়, পুরো বছরই দেওয়া যায়? অন্যদিকে সরকারের খেয়ালীপনায় এ ধরনের ঘটনা বারংবার ঘটছে। কেননা এ পর্ষন্ত এ ধরনের ঘটনার জন্য কিংবা মানুষ হত্যার দায়ে কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি  কিংবা ফাঁসির ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে প্রতিবছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। আর আমাদেরও এসব দুর্ঘটনা সহ্য করতে হচ্ছে। এ বছর থেকে আর যেন কোনো দুর্ঘটনা  না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর তাই সরকার ও আলেম সমাজকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। আমার মতে, সরকারের সক্রিয়তার অভাব, প্রচলিত সমাজ কাঠামো, যাকাত বোর্ডের নিস্ক্রিয়তা, সঠিক  ধর্ম সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানের অভাব, নিজেকে বড় করে দেখানোর প্রবণতা, আলেম সমাজ ও যাকাত প্রদানকারীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, সমাজে সচেতনতার অভাব, ধনীদের দিকে লক্ষ্য রেখে বাজেট প্রণয়ন, সর্বোপরি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবেই বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটছে ।
সরকার যেভাবে প্রতিটি মানুষের কাছ থেকে ভ্যাট আর ইনকাম ট্যাক্স আদায় করছে, ঠিক তেমনি যাকাত বোর্ডকে আরো শক্তিশালী করে প্রত্যেক সম্পদশালী লোকদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে যাকাত আদায় করার ব্যবস্থা করে ইসলামের নির্দেশিত পন্থা অনুযায়ী তা বন্টনের ব্যবস্থা করলে এই সব হীন মানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব। অন্যদিকে প্রতি ইউনিয়নে আলেম সমাজের সমন্বয়ে একটা করে কমিটি করে দিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন থেকে প্রাপ্ত যাকাত  সর্বাধিক হকদারের মধ্য থেকে কয়েকজকে পুরোপুরি স্বাবলম্বী করে দিলে এইধরনের অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনার সাথে সাথে দরিদ্রতা একেবারেই কমে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি