ঢাকা, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭  ,
১৯:৫০:৪৮ জুন  ২০, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় কার্বন কর আরোপের যৌক্তিকতা

Image

আব্দুল হাই রঞ্জু
লেখক: কলামিস্ট

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাড়তি কার্বন নিঃসরণ করলেও তা কমিয়ে আনার অঙ্গিকার থেকে সরে গেছে। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, প্যারিসের সমঝোতা স্মারকের ভবিষ্যত এখন কোন পথে

অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে দিনদিন গোটা বিশ্বটাই যেন অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে টর্নেডো, অকাল বন্যা, অনাবৃষ্টির মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন গোটা বিশ্বের জন্য মস্তবড় সমস্যা। যে সমস্যা নিরসনে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে আনতে জাতিসংঘের উদ্যোগে উন্নত, উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলো যে সম্মেলনে মিলিত হয়, তা কপ-নামে পরিচিত। সর্বশেষ গত বছরের ২২ এপ্রিল প্যারিসে জলবায়ু সংক্রান্ত কপ-২১ এ ১৭০টি দেশ সমঝোতা স্মারকে সাক্ষর করে অঙ্গিকার করেছিল, অন্তত বিশ্বের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামিয়ে আনা হবে। যদিও ঐ সম্মেলনে ঐকমত্যে পৌঁছানো ছিল একটি কঠিন কাজ। উন্নত দেশগুলো বাড়তি কার্বন নিঃসরণের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ অনুন্নত কিম্বা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ১০ হাজার কোটি ডলার সাহায্য প্রদানের অঙ্গিকার করেছিল। কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর মধ্যে চীন, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। যদি উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গিকার পুরণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া না হয়, তাহলে কপ-এর হাজার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও কার্যত কাজের কাজ যে কিছুই হবে না, এটাই বাস্তবতা। আবার এরই মধ্যে বিশ্বের ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই কপ-২১ এ সম্পাদিত জলবায়ু চুক্তি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন। অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাড়তি কার্বন নিঃসরণ করলেও তা কমিয়ে আনার অঙ্গিকার থেকে সরে গেছে। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, প্যারিসের সমঝোতা স্মারকের ভবিষ্যত এখন কোন পথে? বলার অপেক্ষা রাখে না, ডোনাল্ড ট্রাম্প কপ-২১ এর সমঝোতা স্মারক মানেন না। তিনি এও ঘোষণাা করেছেন, এ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাবনা বিশ্বের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য যে অনুকূল হবে, তা আশা করা যায় না। অথচ মানব সভ্যতার বিকাশের পর মানুষের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে জলবায়ুজনিত সমস্যা প্রতিনিয়তই প্রকট হচ্ছে। এ সমস্যা যে পাহাড়তুল্য, তা পাঠকমাত্রই কারো বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
বাস্তবে সাম্রাজ্যবাদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে বিশ্ব মাতব্বর, তা বলার প্রয়োজন পড়ে না। তারা গোটা বিশ্বটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে তাদের স্বার্থ রক্ষা করে। তারা পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসারের বিরোধীতা করে সত্য, কিন্তু নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে সদা সচেষ্ট থাকে। অর্থাৎ তারা অর্থ এবং অস্ত্রের মুখে গোটা বিশ্বকে নিজেদের কব্জায় রাখতে চায়। সাম্রাজ্যবাদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি সমান হলেও দেখা গেছে রিপাবলিকানরা যুক্তরাষ্ট্রের মসনদে বসতে পারলে তাবৎ দুনিয়াটাকে অস্থির করে তোলে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের আগেই প্যারিস চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলেছিলেন। যা তার নির্বাচনী ইশতেহারেও ছিল। মূলত মুসলিম বিদ্বেষী কথাবার্তা ট্রাম্পকে নির্বাচনে জিতিয়ে আনতেও কাজ করেছে। বাস্তবেও মুসলিম ধর্মীয় উন্মাদনার বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর মনোভাব প্রায় একই ধরণের। গোটা বিশ্বে মুসলিম দেশগুলোকে নানাভাবে বিভক্ত করে উন্নত দেশগুলোর আগ্রাসন কোনকালেই কম ছিল না। পারমাণবিক অস্ত্রের মিথ্যা অভিযোগ তুলে মুসলিম সভ্যতার প্রতীক ইরাককে বিরাণ ভূমিতে পরিণত করা হলো। খোদ জাতিসংঘের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যও পরে স্বীকার করেছে, সাদ্দামের হাতে কোন পারমাণবিক অস্ত্র ছিল না। অথচ সেই অজুহাতে ইরাকের লাখ লাখ মানুষকে গোলার আঘাতে জীবন দিতে হয়েছে।
তাদের সেই আগ্রাসন থেকে ইরাকের নিষ্পাপ শিশুরাও রেহাই পায়নি। ইরাকের পর আফগানিস্তানেও পুতুল সরকার বসানো হয়েছে। এখন আবার চোখ পড়েছে সিরিয়ার দিকে। একই ভাবে সিরিয়াকে যে ধ্বংস করা হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। শুধু সিরিয়ায় নয়, তেল সমৃদ্ধ কাতারকে একঘরে করে তেল লুটপাটের নীলনকশা করা হয়েছে। এ নকশাও মার্কিনিরা বাস্তবায়ন করবে। অথচ যুগের পর যুগ ধরে দখলদার ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের ওপর চালাচ্ছে অমানবিক নির্যাতন। যে দেশে জন্ম নেয়া নিষ্পাপ শিশুদের নেই কোন জীবনের নিরাপত্তা। যখন ইসরাইলি আগ্রাসন ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকারগুলোকে লংঘিত করছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের দোসররা তা নিরবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। অথচ আজও ফিলিস্তিনীদের স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জিত হয়নি। কখন কবে হবে, তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলছে অমানবিক জুলুম আর নির্যাতন। তারা তাদের স্বাধীন সত্ত্বার দাবীতে নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করছে যাকে আজ আমরা বলি সন্ত্রাসবাদ কিম্বা জঙ্গিবাদ। যে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ এখন মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। যদিও এ পথে সত্যিকারের  মুক্তি অর্জিত হওয়ার কোন সুযোগ নেই, যা অপ্রিয় হলেও সত্য। ধর্মীয়ভাবে ইসলাম হচ্ছে শান্তির ধর্ম। যে শান্তি এখন মুসলিম দেশগুলো থেকে অনেকটাই নির্বাসনে।
ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের মুরুব্বী সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ তেলসমৃদ্ধ দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মদদে কাতার থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিশ্বের ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম সফরই ছিল সৌদি আরবে। সফর শেষ হওয়ার পরপরই সৌদি আরব কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি ট্রাম্পের তেল লুটের কৌশলকে সমর্থন করে সৌদি আরবসহ বেশ কটি দেশ কাতার থেকে সরে গেছে? বাস্তবে যেখানেই তেল ও সোনার মত খনিজ সম্পদ আছে, সেখানেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছলে বলে কৌশলে সংকট সৃষ্টি করে তা নাম মাত্র মূল্যে লুটে নেয়; এটাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। ক্ষমতাগ্রহণ করেই তিনি নিজের দেশের তৈরি অস্ত্র সৌদিতে বিক্রির চুক্তিটি করতেও ভুল করেন নি! অর্থাৎ প্রতি মুহূর্তেই বিশ্বের শতকোটি মানুষের মানবতা, স্বার্থ, অধিকার লংঘিত হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদি মার্কিন শাসকদের হাতে। তাদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত মোকাবিলায় অর্থ সহায়তা আশা করা, বাতুলতা ছাড়া কিছু নয়! যদিও ইইউসহ অন্যান্য দেশগুলো জলবায়ু তহবিলে অর্থসহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসেনি, বরং বলেছে তারা এই তহবিলে অর্র্থ সহায়তা অব্যাহত রাখবে। কিন্তু বিশ্ব মাতব্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন প্যারিস চুক্তি কপ-২১ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করেছে, তখন এ চুক্তির ভবিষ্যত যে অনেকটাই অনিশ্চিত, তা আর বলতে দ্বিধা নেই।
এমতাবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত থেকে নিজেদের রক্ষায় স্ব-অর্থায়নে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেই বৈশ্বিক উন্নয়নের আগ্রাসনকে রোধ করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদি লুটেরা ধনী দেশগুলোর অনুকম্পার আশায় চেয়ে থাকলে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বসবাস উপযোগী পরিবেশকে রক্ষা করা সম্ভব হবেনা। বাস্তব এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সরকার যে কার্বন কর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তাকে আমরা স্বাগত জানাই। এ প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআরের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান বলেছেন, সবুজ প্রকল্পের অন্যতম অংশ এই কর বাস্তবায়িত হলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপাদনের জন্য বা পরিবেশ দূষিত করার জ্বালানি ব্যবহারের ওপর কর আদায় করা হবে। যা দিয়ে কার্বন নিঃসরণের কারণে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বনায়নসহ প্রয়োজনীয় কর্মসূচী গ্রহণ করা হবে। এ কর্মসূচী বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মডেল হিসেবে অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর মধ্য কম হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রশংসার দাবিদার। এ ছাড়াও সরকারের কার্বন কর বাস্তবায়নের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে দেশের ব্যবসায়ী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন। এসব দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানীগুলো কার্বন করের বিরোধীতা করে আসছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র কার্বন উৎপন্ন করে ১৬.৪ টন, অষ্ট্রেলিয়া ১৬.৩ টন ও কাতারের মত দেশ কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন করে ৪০.৫ টন। সেখানে বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণ হয় মাত্র ০.৪৪ টন। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, সবক্ষেত্রে কার্বন কর আরোপ করা হলে জ্বালানী ব্যবহারকারী কার্বন করের কারণে অনেক কোম্পানী বন্ধ হতে পারে। এ কারণে উন্নত দেশগুলোয় কার্বন কর প্রদানে নিয়োজিত কোম্পানীগুলো বরাবরই বিরোধীতা করে আসছে।
তবে, কার্বন কর নির্ধারনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যেন এই করের বোঝা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে না চাপে। মূলত বিভিন্ন বিদ্যুৎ কোম্পানী বা শিল্প প্রতিষ্ঠানে কার্বন নিঃসরণ হয় বেশি। যদি মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) আওতায় পণ্যের ওপর যে ভ্যাট আরোপ হয়, সে রকমভাবে শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকগণ যদি কার্বন কর উৎপাদিত পণ্যের ওপর ধার্য্য করে পণ্য বিপনন করে, তাহলে পরোক্ষভাবে সাধারণ ভোক্তাদের কষ্ট বাড়বে। এ জন্য আমাদের দেশে আইন করে কার্বন কর এমনভাবে ধার্য করতে হবে, যেন কার্বন করের কারণে ভোক্তার কষ্ট না বাড়ে। তবে সর্বিক অর্থে এর বিরূপ প্রভাবের চেয়ে ইতিবাচক প্রভাবই বেশি হবে। বিশেষ করে আমাদের দেশটি শিল্পোন্নত দেশ নয়। এ কারণে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কম। এখানকার যানবাহনগুলোর অধিকাংশই ফিটনেসবিহীন। ফলে নগর-মহানগরগুলোয় ব্যাপক পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়। ফলে নগর মহানগরে বসবাসরত মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকিও অনেক বেশি। এক্ষেত্রে কার্বন কর নির্ধারণ করা হলে ফিটনেসবিহীন গাড়ীর সংখ্যা কমে আসলে কার্বন নিঃসরণও কমে আসবে। যা বাস্তাবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।  তা নাহলে জনস্বার্থ রক্ষা করা কখনও সম্ভব হবে না।
বাস্তব এই বিবেচনায় জলবায়ু পরির্বতনজনিত অভিঘাত মোকাবেলায় সময় থাকতেই কার্বন করের আওতা বৃদ্ধি করে পরিবেশ বান্ধব টেকসই সামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তানা হলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অভিঘাত থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি