ঢাকা, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭  ,
২১:৫৮:৩০ জুন  ১৯, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


মো. আবুল হাসান ‘ওচি’ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি নির্দেশ চাই

খন রঞ্জন রায়



বাংলাদেশ ব্যতিক্রমী ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বারবার ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ছে। বঙ্গোপসাগরের উত্তর দিক ডিম্বের আকৃতির ফলে ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসের দেশ বাংলাদেশ। বছরের এপ্রিল-মে মাস জুড়েই থাকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ভয়। উপকূলীয় এলাকায় লক্ষ লক্ষ মানুষ তখন আতংক আর উদ্বেগের মধ্যে থাকে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের উপকূলের দিকে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ নামটি ঠিক করেছিল থাইল্যান্ডের আবহাওয়াবিদরা। থাই ভাষার ‘মোরা’ শব্দের বাংলা অর্থ ‘সাগরের তারা’। ২০১৬ সালের ২ থেকে ৬ মে ভারতের নয়াদিল্লিতে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীর অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড় বিষয়ক প্যানেলের বৈঠকে নামটি ঠিক করা হয়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এবং জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক-সামাজিক সহযোগিতামূলক সংস্থা এসকাপ নয়াদিল্লির ওই বৈঠকের আয়োজন করে। বৈঠকে মোট ছয়টি ঘূর্ণিঝড়ের আগাম নাম চূড়ান্ত করা হয়। সাধারণত আঞ্চলিক পর্যায়ের নিয়ম অনুসরণ করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের নাম রাখা হয়। পূর্বনির্ধারিত নামের তালিকা থেকে একেকটি ঝড়ের নাম দেওয়া হয়।
১৯৯৯ সালে ভারতের ওড়িশায় ঘূর্ণিঝড়ের পর ২০০০ সালে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ও এসকাপ তাদের বৈঠকে উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ শুরুর বিষয়ে একমত হয়। ২০০৪ সালে প্রথম ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয় অনিল। গত বছর ঠিক করা নামগুলোর মধ্যে প্রথম ঘূর্ণিঝড় ‘মারুথা’ গত ১৭ এপ্রিল মিয়ানমার উপকূলে দুর্বল অবস্থায় আঘাত হানে। এরপরের ঘূর্ণিঝড়ের নাম রাখা হয়েছিল ‘মোরা’। এরপর পর্যায়ক্রমে যে ঘূর্ণিঝড়গুলোর আসবে সেগুলোর নাম যথাক্রমে ওচি, সাগর, ম্যাকুনু ও ডায়ে। এর মধ্যে ওচি নামটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে। ঝড়ের পূর্বাভাস জানার জন্য বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো উপগ্রহ নেই। নাসা ও নোয়া এই দুই উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত উপাত্তের ভিত্তিতে তারা ঝড়ের পূর্বাভাস দিয়ে থাকে।
ঘূর্ণিঝড় মোরায় দেশের উপকূলীয় ১৬ জেলার ৫৪ হাজার ৪৮৯টি পরিবারের দুই লাখ ৮৬ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ১৯ হাজার ৯২৯ টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ এবং ৩৯ হাজার ৫৯৯টি ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য এ পর্যন্ত এক হাজার ৭০০ টন চাল এবং এক কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ঢেউটিন ও গৃহ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৯ লাখ টাকা। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ২৫ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। ঝড়ে এক হাজার ৫৯২ একর জমির পানের বরজও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ ও সাগরে নিখোঁজ লোকজনকে উদ্ধারে অভিযানে যুক্ত ছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনী। কুতুবদিয়ার নিকট গভীর সমুদ্রে বিকল হওয়া একটি ডুবন্ত বোট হতে ২০ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করেছিল তারা। এদিকে ঘূর্ণিদুর্গতদের জন্য ভারতীয় ত্রাণ নিয়ে আসার পথে সাগর থেকে ৩৩ জনকে উদ্ধার করেছিল ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজ আইএনএস সুমিত্রা। মোরা’র আঘাতে উপকূলীয় এলাকার গৃহহারা মানুষের কষ্টের জীবন চলছে। খাল-বিল, পুকুর, নদী-নালা সমুদ্রে লবন পানি ঢুকে গেছে। খাবার পানির মারাত্মক সংকট। শিশু, মহিলা, বৃদ্ধরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছে। এক ইউনিয়ন থেকে অন্য ইউনিয়নে গিয়ে খাবার পানি সংগ্রহ করে পান করতে হচ্ছে।
১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ের স্থায়িত্বকাল ছিল কয়েক দিন। আওতায় বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) উপকূলীয় অঞ্চল। বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল প্রতি ঘন্টায় ২২২ কিলোমিটার। জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ১০.৬০ মিটার। বিপুল সহায় সম্পদ ধ্বংস এবং গবাদিপশুর মৃত্যু ছাড়াও শুধু মানুষ মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচ লক্ষাধিক। ২০০৭ সালে আঘাত হেনেছিল সিডর। স্থায়িত্বকাল ১০ ঘন্টা। ব্যাসার্ধ ৪৮০ কিলোমিটার। বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল প্রতি ঘন্টায় ২৬০ থেকে ৩০৫ কিলোমিটার। জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ২৫ থেকে ৩০ ফুট। বিপুল সহায়-সম্পদ ধ্বংস এবং গবাদিপশু ছাড়াও প্রাণহানি এক হাজার ১০০ জনের। বিপদ সঙ্কেত ছিল ১০ নম্বর।
২০০৯ সালে আঘাত হেনেছিল আইলা। স্থায়িত্বকাল ৯ ঘন্টা। ব্যাসার্ধ ৩০০ কিলোমিটার। বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ১৩০ কিলোমিটার। জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ১০ থেকে ১২ ফুট। বিপুল সহায়-সম্পদ ধ্বংস এবং গবাদিপশু ছাড়াও হতাহতসহ নিখোঁজ কয়েক হাজার। ২০১৭ সালের ৩০ মে কুতুবদিয়া ও সেন্টমার্টিনে আঘাত হানে মোরা। স্থায়িত্বকাল ৫ ঘন্টা। ব্যাসার্ধ ২০০ কিলোমিটার। বাতাসের গতিবেগ ৮৯ থেকে ১১৭ কিলোমিটার। পাঁচ-সাত ফুট জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কার কথা বলা হলেও ভাটার কারণে ভয়াবহ হয়নি। বিপদ সঙ্কেত ছিল ১০ নম্বর।
নীতি নির্ধারকরা বিশেষ করে দেশ পরিচালনায় দায়িত্বশীলরা গর্ব করে বলে থাকেন বাংলাদেশের জনগণ দুর্যোগ মোকাবিলায় পারদর্শী। বাস্তবে প্রতিটি দুর্যোগ উপকূলের প্রতিটি পরিবারে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে। আপনজন হারিয়ে, পঙ্গু হয়ে, বসতবাড়ী ভিটে, হালের পশু হারিয়ে নিঃস্ব হয় মানুষ। ডিপ্লোমা শিক্ষায় প্রশিক্ষিত না হওয়ার কারণে যুবকরা বেকার হয়ে যাযাবর জীবন যাপন করে। স্থান করে নেয় শহরের বস্তিতে, পথহারা দিকনির্দেশনাহীন তরুণদের এক শ্রেণির সুবিধাবাদি খুন-খারাবি ও মাদকদ্রব্য বিক্রির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশের এক গবেষণায় প্রকাশ পায় বাংলাদেশের বস্তির ৭৪ শতাংশ অধিবাসী ৭০-এর প্রলয়ংকরী সাইক্লোন, ৯১-এর ঘূর্ণিঝড় ও সর্বশেষ ২০০৭-এর সিডর এবং ২০০৯-এর আইলার আঘাতে সর্বস্ব হারিয়ে অভ্যন্তরীণ রিফিউজির জীবন যাপনে বাধ্য হয়েছে।  ঘূর্ণিঝড় মোরার ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জানতে আরো সময় লাগবে। তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় বস্তির নিয়ন্ত্রক কিংবা কর্ণধারেরা অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছেন তাদের দল ভারি করার জন্য। অন্যদিকে এক গোষ্ঠী ত্রাণের অর্থ দিয়ে গাড়ী, বাড়ী গড়ে তুলবেন। রাত পোহালে পবিত্র ঈদুল ফিতর। অনেকের চুলার আগুন জ্বলবে না। উপকূলবাসীরা সাগরে পুষ্টিকর মৎস্য ও শাক সবজি খেয়ে থাকে। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশী। উপকূলবাসীরা শারীরিকভাবে কাঠামো মজবুত এবং সাহসী। তারা যে কোন অসাধ্য কাজকে সাধন করতে সচেষ্ট। পৃথিবীর সবদেশেই উপকূলে ও দ্বীপে সাগরভিত্তিক শীপ মেকিং, শীপ পরিচালনা, শীপ ব্রেকিং, খনিজ আবিস্কার, সম্পদ উত্তোলন, লবণ, পর্যটন, মৎস্য আহরণ, মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ, মেডিকেল অ্যাসিসট্যান্ট, ডেন্টাল অ্যাসিসট্যান্ট, মিডওয়াইফ নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট হিসাবে জনশক্তি গড়ে তোলা হয়। পেশা ও পণ্যভিত্তিক ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট নির্মাণে ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রশিক্ষিত ডিপ্লোমা প্রযুক্তিবিদরা স্থানীয়ভাবে নিজেরা নিজেদের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেন। মৌসুমী ত্রাণ দিয়ে উপকূলবাসীদের জীবনীশক্তি নষ্ট করে দেওয়া হয় না।
বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসের প্রবণতা কমবার মতো ভৌগলিক অবস্থান নেই। যে কোন সময় আঘাত আনতে পারে ওচি, সাগর, ম্যাকুন কিংবা ডায়ে। উপকূল, পাহাড়, পর্বত, সমতল নিয়েই প্রিয় বাংলাদেশ। সব এলাকার মানুষকেই সামগ্রীকভাবে তার অধিকার দিতে হবে। নাগরিক হিসাবে আমরা সকলেই সমান। বাংলাদেশের সব অঞ্চলের উন্নয়ন অগ্রগতি সমানভাবে চলুক সেটাই জনগণ চায়। উপকূলের মানুষের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দূর করতে হবে। একটা দুর্যোগ নানা ক্ষতর সৃষ্টি করে। এখনো আইলার আঘাতের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারেনি উপকূলীয় মানুষজন। এরপর একটার পর একটা আঘাত আসতে থাকলে সেটি আরো দুর্ভাগ্যের কারণ হবে। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় এখনো অনেকটাই অধরা। তবে দুর্যোগ পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমিয়ে আনা যায়। সে লক্ষ্যে প্রশাসনকে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা প্রশিক্ষণে মনোযোগী হতে হবে।
টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টসমূহের (এসডিজি) মধ্যে কূল-উপকূল সকলের জন্য টেকসই ব্যবস্থাপনা ও প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ অন্যতম। সময়োচিত পদক্ষেপে এসডিজি অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশে উপকূলবাসীদেরও এগিয়ে যেতে হবে। উপকূলের জীবন যাত্রার মানে উন্নয়নের লক্ষ্যে তরুণ যুবাদের টার্গেট নির্ধারণ করতে হবে। তাদের সময়োপযোগী কর্মকেন্দ ীক ডিপ্লোমা শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। দ্বীপ উপকূলে প্রতিষ্ঠা করতে হবে যুগোপযোগী ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট।
লেখকদ্বয়: কলামিস্ট


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি