ঢাকা, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭  ,
২১:৫৫:৩৪ জুন  ১৯, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


প্রতিবন্ধীরাও মানুষ সমাজের বোঝা নয়

ইঞ্জিনিয়ার এম এম আবুল হোসেন

একজন সুস্থ সবল ব্যক্তিকে বর্তমানে যেখানে জনসে াতের প্রবল ধাক্কায় যে কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে প্রতিবন্ধীদের প্রতিনিয়ত কী দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়, তা সহজেই অনুমান করা যায়। তাদের চলার পথের বাধা দূর করতে বড় বড় পরিকল্পনা গ্রহণই যেন শেষ কথা না হয়- সেদিকে সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যে কোনো পরিকল্পনার সুফল তারা পাচ্ছে কি-না- এটাই বড় কথা। বাস্তবতা হচ্ছে, একজন প্রতিবন্ধী দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলেও সামান্য সহযোগিতার জন্য কেউ হাত বাড়াতে চায় না।
এর কারণ, বহুভাবে প্রতারিত হওয়ার পর পরস্পরের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস বেড়েই চলেছে। প্রতিবন্ধীদের ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করে ভিক্ষাবৃত্তিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে তাদের প্রতি মানুষের সহমর্মিতাও অনেক কমে গেছে। এসব সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রকে ভূমিকা রাখতে হবে। প্রতিবন্ধীদের নামে বরাদ্দ অর্থ ও অন্যান্য সহযোগিতা নিয়ে যেন দুর্নীতি না হয়, সেদিকেও কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে।
প্রতিবন্ধিতা-বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী শিশু বলতে অসুস্থতার কারণে, দুর্ঘটনায়, চিকিৎসাজনিত ত্র“টি বা জš§গতভাবে যদি কারও শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মাধ্যমে কর্মক্ষমতা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে লোপ পায় বা তুলনামূলকভাবে কম হয়, তাহলে সেই শিশু প্রতিবন্ধী।
প্রতিবন্ধিতার ধরনগুলো হচ্ছে: ১. অটিজম, ২. চলনপ্রতিবন্ধিতা, ৩. দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতা, ৪. দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, ৫. বাক্প্রতিবন্ধিতা, ৬. বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, ৭. শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, ৮. সেরিব্রাল পালসি, ৯. বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা ও ১০. অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের (সিআরসি) ২৩ ধারা অনুযায়ী, অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুর মতো প্রতিবন্ধী শিশুরাও সমঅধিকার ও সমসুযোগ পাওয়ার অধিকারী।
২০০৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক একটি সনদ (সিআরডিপি) গৃহীত হয়। এ সনদ ২০০৮ সালের ৩ মে থেকে কার্যকর হয়। সিআরসি ও সিআরপিডি সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলো প্রতিবন্ধী শিশুসহ সব শিশু যেন কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই তাদের অধিকার ভোগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করবে। এই দুটি সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। জাতীয় শিশু নীতিমালাতেও প্রতিবন্ধী শিশুসহ সব শিশুর অধিকার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিবন্ধীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক। তাদের মেধার বিকাশে যথেষ্ট উদ্যোগ নেই। প্রতিবন্ধীদের দিয়ে কিছুই হবে না এই ভেবে তাদের বাতিলের খাতায় ফেলে রাখা হয়। এমনকি নিজ পরিবারেও প্রতিবন্ধী শিশুরা নিগৃহীত হয়। তাদের বোঝা মনে করা হয়। জীবনের প্রতি পদে তারা অবহেলার শিকার হয়।
জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা নিশ্চিত করার ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১-এতেও প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাসেবা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তার পরও শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী শিশুদের অংশগ্রহণ খুবই কম।
জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল তার বিশ্ব শিশু পরিস্থিতি ২০১৩ প্রতিবেদনে প্রতিবন্ধী শিশুদের উন্নয়নে কয়েকটি সুপারিশ করেছে। সুপারিশগুলো হচ্ছে: প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সনদ ও শিশু অধিকার সনদ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। সাধারণ মানুষ, নীতিনির্ধারক এবং শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষার মতো জরুরি সেবা যাঁরা দিয়ে থাকেন, তাঁদের মধ্যে প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
একীভূতকরণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে, যেন পরিবেশ শিশুবান্ধব হয়। যেমন বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা, জনপরিবহন প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রবেশগম্যতা সহজ হয় এবং প্রতিবন্ধী শিশুরা যেন তাদের সহপাঠী বা সমবয়সীদের মতো অংশগ্রহণে উৎসাহিত হয়। প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য পরিবারভিত্তিক সেবা ও কমিউনিটিভিত্তিক পুনর্বাসনের বিস্তার ঘটাতে হবে এবং এসব ক্ষেত্রে সহায়তা ত্বরান্বিত করতে হবে। পরিবারগুলোকে সহায়তা দিতে হবে, যেন তারা প্রতিবন্ধী শিশুদের জীবনযাপনের জন্য যে বাড়তি খরচ হয়, তা মেটাতে পারে এবং আয়ের হারানো সুযোগ ফিরে পেতে পারে। প্রতিবন্ধী শিশু ও তাদের পরিবারের চাহিদা পূরণের জন্য যেসব সহায়তা এবং সেবার পরিকল্পনা করা হয়, সেগুলো মূল্যায়নে প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোর-কিশোরীসহ তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে এর ন্যূনতম মানকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। সব খাতের সেবাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হবে, যেন প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোর-কিশোরী এবং তাদের পরিবার যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, সেগুলোকে পূর্ণমাত্রায় মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জীবনকে প্রভাবিত করে, এমন সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোর-কিশোরীকে শুধু সুবিধাভোগী হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তনের প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিবন্ধিত্ব বিষয়ে একটি বৈশ্বিক সামঞ্জস্যপূর্ণ গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। এর মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য ও তুলনামূলক উপাত্ত পাওয়া যাবে, যা পরিকল্পনা ও সম্পদ বণ্টন সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রতিবন্ধী শিশুদের বিষয় আরও সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা হোসেন পুতুল আশা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রতিবন্ধীদের সহযোগিতা বিষয়ে ভবিষ্যতে সারাবিশ্বে নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধিদের সহযোগিতা বিষয়ে বিশ্ব এখন যা চিন্তা করছে আমরা ইতোমধ্যেই তা করে দেখিয়েছি। আমরা প্রতিবন্ধিতাবান্ধব কর্মসূচি বিষয়ে ভবিষ্যতে বিশ্বে নেতৃত্ব দিতে চাই।
সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সমসুযোগ ও সমঅধিকার রয়েছে এবং জাতীয় উন্নয়নে দেশের সকল নাগরিকের সমঅংশীদারিত্বের সুযোগ সৃষ্টি একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নাগরিকদেরও রয়েছে উন্নয়নের ও অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার। প্রতিটি প্রতিবন্ধী নাগরিক প্রথমে নাগরিক, পরে প্রতিবন্ধী।
লেখক: কলামিস্ট
 


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি