ঢাকা, মঙ্গলবার ২৭ জুন ২০১৭  ,
১০:৪৯:০৫ জুন  ১৯, ২০১৭ - বিভাগ: ইসলাম


দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া উত্তম কাজ

Image

মোমিন-মুসলমানের বেশি বেশি পুণ্য অর্জনের সুবর্ণ সময় হচ্ছে মাহে রমজান। যত বেশি ইবাদত তত বেশি পুণ্য। আর শুধু ব্যক্তিগতভাবে নিজে ইবাদত করে পুণ্য অর্জন নয়, অন্যকেও দ্বীনের দাওয়াত দিয়েও পুণ্য হাসিল করা যায়। রমজান হচ্ছে দ্বীনের দাওয়াতের সর্বোত্তম মাস।


দাওয়াতে দ্বীন ছিল সব নবীর গুরু দায়িত্ব ও কর্তব্য। এমন কোনো নবী আসেননি যিনি মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের দিকে দাওয়াত দেননি। সব নবীর মূল দাওয়াত ছিল- ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো উপাস্য নাই।’ (সূরা আরাফ- ৫৯)

পবিত্র কোরআনের এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, দাওয়াত শুধু আল্লাহর ইবাদতের দিকে হবে। দুনিয়াবি স্বার্থ কিংবা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের দিকে নয়। এতে কোনো বংশীয়, দেশীয় এবং জাতীয় স্বার্থ থাকতে পারবে না। দাওয়াতে দ্বীনের পিছনে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির চিন্তাও থাকতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘আমি তোমাদের কাছে দাওয়াতে দ্বীনের জন্য কোনো পারিশ্রমিক চাই না।’ (সূরা শোয়ারা- ১২৭)

দাওয়াত মুসলমান-অমুসলমান সবার কাছেই দিতে হবে। মুসলমানদের দুর্বল আকীদা-বিশ্বাস এবং আমল-আখলাক মজবুত করার লক্ষ্যে তাদের কাছে দ্বীনের শিক্ষা তুলে ধরতে হবে। শয়তানের ওয়াসওয়া এবং জাগতিক লোভ-লালসায় তাদের আমল দুর্বল হতে থাকে। দাওয়াতে দ্বীনের মাধ্যমে তাদের মন-মগজকে পরিশুদ্ধ করে আমলকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হয়। যেমন ভোঁতা ছুরি ঘষে ধারালো করতে হয়।

আল্লাহ জাল্লাশানুহু দ্বীনের দাওয়াতকে অধিক পছন্দ করেন। পবিত্র কোরআনে তিনি বলেন, ‘ওই ব্যক্তির চাইতে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে ডাকলো, নেক আমল করলো এবং ঘোষণা করলো, আমি একজন মুসলমান ?’ (সূরা হা-মিম সাজদাহ-৩৩)

সুতরাং এই দাওয়াতি কাজ যারা করবেন তাদেরও তিনি ভালবাসবেন স্বাভাবিকভাবে। হাদিসে এসেছে- রাসূল (সা.) হযরত আলীকে (রা.) বলেছেন, ‘হে আলী একজন মানুষকে হেদায়েত করতে পারা দুনিয়ার সর্বোত্তম নিয়ামত।’ (বোখারি ও মুসলিম)

এ হাদিসে মানুষের মধ্যে দাওয়াতি কাজ করে তাদের হেদায়াত করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে এবং এটিকে আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত বলা হয়েছে। যার কথা ও কাজ দ্বারা যত বেশি লোক হেদায়েত লাভ করবে কিংবা সংশোধন হবে, সে ব্যক্তি ততো বেশি সওয়াব ও নিয়ামতের অধিকারী হবে। অমুসলমানদের প্রতি দাওয়াতি কাজের গুরুত্বও অপরিসীম। দাওয়াতি কাজের মাধ্যমেই বৃহত্তম মুসলিম উম্মাহ তৈরি হয়েছে।

দাওয়াতে হেদায়েতপ্রাপ্ত লোকের আমলের সমান সওয়াব পাবেন দাওয়াতকারী ব্যক্তি। দাওয়াতি কাজের এই গুরুত্ব সম্পর্কে আরেকটি হাদিসে এসেছে রাসূল (সা.) বলেছেন- ‘তোমরা আমার কাছ থেকে একটি আয়াত হলেও তা পৌঁছাও।’ এই হাদিসে বলা হয়েছে, যে যতটুকু জানে, এমনকি একটি বিষয় জানলেও তা মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।

রাসূল (সা.) বিদায় হজ্বের ভাষণ শেষে বলেন, ‘তোমাদের যারা উপস্থিত, তারা অনুপস্থিত লোকের কাছে পৌঁছাবে।’ এই হাদিস দ্বারাও দাওয়াতি কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রমজানের মাধ্যমে সমাজে পবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দাওয়াতি কাজ হচ্ছে সেই পরিবেশ সৃষ্টির হাতিয়ার।

মানুষকে দাওয়াত দিতে হবে আন্তরিকতা, সত্যবাদিতা ও আল্লাহর কাছে আশাবাদের ভিত্তিতে। লোক দেখানো কিংবা দুনিয়াবি কোনো উদ্দেশ্যে দাওয়াতি কাজ করা যাবে না। আগে নিজে আমল করতে হবে এবং তার পরে অন্যের কাছে দাওয়াত দিতে হবে। নিজে আমল না করে অন্যকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া লজ্জার বিষয়।

এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘তোমরা কি লোকদের নেক কাজের আদেশ করো এবং নিজেদের কথা ভুলে যাও? অথচ তোমরা আল্লাহর কিতাব পাঠ করো; তোমরা কি জ্ঞানের অধিকারী নও?’ (সূরা বাক্বারা- ৪৪)

দাওয়াতে ভাষা, উপস্থাপনা ও ব্যবহার হবে নমনীয় ও কোমল। দাওয়াত দেওয়ার সময় কঠোরতা ও রূঢ়তার প্রদর্শন করা যাবে না। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা উভয়ে তাকে নরম সুরে বলো, সম্ভবতঃ সে স্মরণ করবে কিংবা ভয় করবে।’ (সূরা ত্বহা – ৪৪)

এখানে হযরত মূসা (আ.) ও হারূনকে (আ.) ফেরাউনের কাছে গিয়ে নরমভাবে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেছেন, হতে পারে, সে ভাল হবে আল্লাহকে ভয় করবে। আল্লাহ জাল্লাশানুহু আরো বলেছেন, ‘এটি আল্লাহরই অনুগ্রহ যে, তুমি (নবী) লোকদের প্রতি খুবই বিনম্র। তুমি যদি রূঢ় ও পাষাণ অন্তরের অধিকারী হতে, তাহলে এসব লোক তোমার চারপাশ থেকে সরে যেতো।’

লোকের কাছে পর্যায়ক্রমে দাওয়াত দিতে হবে। প্রথমে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও পরে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দাওয়াত দিতে হবে। রাসূল (সা.) নিজেও এ পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তিনি যখন হযরত মোয়াজকে (রা.) ইয়েমেন পাঠান, তখন বলেন, তুমি এমন এক কওমের কাছে যাচ্ছো যারা আহলে কিতাব। তুমি তাদের প্রথমে কালেমার দাওয়াত দেবে। যদি তারা তা গ্রহণ করে তাহলে তাদের বলবে যে, আল্লাহ তোমাদের ওপর দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন।’ (বোখারি ও সুসলিম)

দাওয়াতি কাজে সম্ভাব্য সব রকমের কৌশল, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, বিজ্ঞতা ও হেকমত অবলম্বন করতে হবে। দাওয়াতকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গ্রামবাসীর জন্য যে আবেদন হবে, শহরবাসীর জন্য তা হবে ভিন্ন রকমের। আবার শিক্ষিতের জন্য আবেদন, অশিক্ষিত লোকের আবেদনের চাইতে ভিন্ন রকমের হবে।

দাওয়াতের জন্য সুন্দর করে বক্তব্য পেশ করতে হবে। কোরআনে এটিকে ‘মাওয়েজায়ে হাসানাহ’ বলা হয়েছে। যেমন সুন্দর উপমা ও বাগধারা প্রয়োগ, সুন্দর গল্প-কাহিনী ও প্রবাদ ইত্যাদি। এ সম্পর্কে কোরআনুল করিমে রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘হে নবী! তোমার রবের পথে লোকদের ডাক হেকমত এবং সুন্দর বক্তব্যের মাধ্যমে।’ (সূরা নাহল)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দাওয়াতে স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে এবং শ্রোতার মানসিকতা অনুযায়ী কথা বলতে হবে। যুক্তি-বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে শ্রোতার মন জয় করতে হবে। অভিজ্ঞ ডাক্তারের ন্যায় উপযুক্ত রোগ নির্ণয় করে যথার্থ চিকিৎসা করতে হবে।

রাব্বুল আলামিন আমাদের সঠিকভাবে আমল করার এবং অন্যকে সুন্দরভাবে দ্বীনের দাওয়াত প্রদান করে অশেষ নেকি হাসিলের তাওফিক দান করুন। -আমিন।


ইসলাম'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি