ঢাকা, বুধবার ১৮ অক্টোবর ২০১৭  ,
২০:৫১:৫১ জুন  ১৮, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


বর্জ্য ভর্তি তিন বস্তার আত্মকাহিনী

Image

নাজমা সুলতানা
লেখক: কলামিস্ট

আমরা ধানমন্ডির ১৪ নম্বর সড়কের পাশে দীর্ঘ এক মাস থেকে পড়ে থাকা আবর্জনা বোঝাই বস্তা। মনের দুঃখে প্রাণ আমাদের ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়। প্রতিদিন রাতের আঁধারে আমরা ডুকরে ডুকরে কাঁদি। কাঁদতে কাঁদতে সৃস্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা জানাই- তিনি যেন আমাদের কান্না শোনেন। আমাদের অপাংক্তেয় হয়ে এভাবে পড়ে থাকতে আর ভালো লাগে না। আমাদের আসল গন্তব্যে যাওয়ার সুযোগ যেন তিনি করে দেন। ময়লার ভাগাড় কিংবা যেখানেই হোক আমাদের সেখানে পৌঁছে দেওয়া হোক।
কিন্তু কী পোড়া কপাল আমাদের। এতো যে ভাগ্য বিধাতাকে ডাকলাম। কেঁদে কেঁদে নাক ও চোখের পানি একাকার করে ফেললাম। কিন্তু সিটি করপোরেশনের নিয়মিত ঝাড়–দারের কৃপা দৃষ্টি পড়ল না আমাদের ওপর। তার ছোট্ট ঠেলাগাড়িতে করে বড় ডাস্টবিনে আমাদর ফেলে দিয়ে এলেও দুঃখ মোচন হতো। কিন্তু দীর্ঘ ১ মাসেও তার নজরে পড়লাম না আমরা।
ঝাড়–দার ছাড়াও প্রতিদিনি আশেপাশের ফ্লাটবাড়ি থেকে ময়লা-আবর্জনা নিতে আসা ‘রিকশা ভ্যান গাড়িওয়ালাদের’ চোখও আমাদের ওপর পড়ে না। ফ্ল্যাট বাড়ি থেকে প্লাস্টিকের ড্রামভর্তি ময়লা-আবর্জনা ভ্যানে ঢেলে নিয়ে তারা চলে যায়। আমরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখি কিন্তু আমাদের মতো ছোট্ট তিনটি বস্তা ভ্যান গাড়িতে তুলে নেওয়ার ইচ্ছা তাদের জাগে না। ফ্ল্যাট বাড়িওয়ালারা তাদের ভালো টাকা দেয়। সেজন্যই হয়তো তাদের ড্রাম ভর্তি ময়লা-আবর্জনা নিয়ে থাকেন তারা। আর আমাদের তো টাকা, ড্রামভর্তি পয়সা নেই। কোত্থেকে তা পাবো আমরা? তাহলে কী এভাবে মাস গড়িয়ে বছর চলে আসবে? তারপরেও আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না?
দীর্ঘদিন পচা-গলা আবর্জনা পেটে ধারণ করে রাত আর দিন পার করে দিচ্ছি আমরা। বুঝতে পারি পেটের ভিতর হয়তো পোকা মাকড়ের জন্ম হয়েছে। মনে হয় সারাক্ষণ কী যেন কুঁরে-কুঁরে খাচ্ছে। অস্বস্তি লাগে। কী এমন পাপ করেছি যে, ঝাড়–দার কিংবা সমাজকল্যাণ নামধারী ঠিকাদার চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকরা আমাদের স্পর্শই করে না। রোজ রোজ যখন ওরা ড্রাম খালি করে ময়লা আবর্জনা নিজেদের ভ্যানে খালাস করে তখন ভাবি-এই বুঝি আমাদের টুটি চেপে ধরে এক ঝটকায় তাদের ভ্যানে তুলে নিল...। এই বুঝি আমাদের কষ্টের পরিসমাপ্তি ঘটল। আর বুঝি রাতের আঁধারে সড়কের পাশে পড়ে থাকতে হবে না...। আর হয়ত রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে গুমরে গুমরে কাঁদতে হবে না। কিন্তু হা-হতোস্মি! কোনো কিছুতেই কোনো কিছু হয় না..। এভাবেই আর কত দিবস রজনী যে পড়ে থাকতে হবে তাও জানি না।
এই সেদিন ‘বসতি পিস ভিল’- এর দু’জন ফ্ল্যাট মালিক আমাদের পাশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আক্ষেপ করছিলেন, ‘সিলেট করপোরেশন পেয়েছে কী? সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে সড়কের পাশ থেকে আবর্জনা এবং ময়লাভর্তি বস্তা ও ঝুড়ি অপসারণ করবে না। ৫/৭ দিন পর পর রাস্তা ঝাড়ু দেবে। নিশ্চয়ই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে খোঁজ খবর নেন না। মাঠ পর্যায়ের পরির্দশকদের তদারকি যাচ্ছেতাই বলেই এমন ঘটনা। কবে যে এব বিষয়ে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে তা কে জানে?
জবাবে অপর ফ্ল্যাট মালিক বললেন, পাকিস্তান আমলের পরেও কিছুদিন ব্যবস্থপনায় একটা শৃঙ্খলা ছিল। এই কিছুদিন থেকে এ ব্যবস্থা জঘন্য হয়ে উঠেছে। তখন সিসিসি’র কর্মীরাই ‘বর্জ্য’ অপসারণ করত। কোনো কোনো সমাজদরদী এক্ষেত্রে ‘চমক’  সৃষ্টির জন্য নিজেরা লোক ঠিক করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ১০ টাকা চাঁদা নিয়ে বর্জ সংগ্রহ করে ভাগাড়ে ফেলার ব্যবস্থা করেছে। মনে আছে- কলাবাগান এলাকায় ঘন্টি বাজিয়ে বর্জ্য সংগ্রহ করা হতো। যারা ওপর তলায় থাকতেন তারা দড়িতে বালতি বেঁধে ময়লা নামিয়ে দিতেন।
এবার ১ম ফ্ল্যাট মালিক বললেন, সেটাই এখন আমাদের কাল হয়েছে। ১০ টাকার বদলে এখন প্রতি ফ্ল্যাট থেকে ৮০/১০০ টাকা নেয়া হচ্ছে। অথচ একটি এপার্টমেন্টের ৩০-৫০ টি ফ্ল্যাটের বর্জ্য একত্রে নেয়া হয়। এতে ২/৩ ড্রাম বর্জের জন্য মালিক সমিতির কাছ থেকে আড়াই হাজার থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। অবাক কাণ্ড, ভ্যান গাড়িওয়ালা শ্রমিকরা আবার সব ধরনের আবর্জনা নেয় না। লিচু-আমের ঝুড়ি, ভাঙ্গা চিনামাটির বর্জ্য, ইলেকট্রিক দ্রব্যের বাক্সে ব্যবহৃত শোলা, টিউবলাইট, বাল্ব, ছেড়া জুতা-স্যান্ডেল, চুন-সুরকি-পলেস্তারা, ঘর মোছার জন্য ব্যবহৃত কাপড় ইত্যাদি বেছে বেছে  এপার্টমেন্টে সেগুলো কোথায় ফেলবে সে ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই। শ্রমিকদের খামখেয়ালিপনা কী তাহলে চলতেই থাকবে?
২য় ফ্ল্যাট মালিক কথাটা লুফে নিয়ে বলে চলেন, আপনি কী জানেন, আমাদের কাছ থেকে যে চাঁদা নেয়া হয় তার কানাকড়িও ওদের ভাগ্যে জোটে না। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সব টাকা নিয়ে নেয়। শ্রমিকরা ময়লা ঘেঁটে কিছু জিনিস ভাঙ্গারি দোকানে বিক্রি করে যা পায় সেটাই ওদের মজুরি।
১ম ফ্ল্যাট মালিক তা শুনে বলে উঠলেন, বলেন কী? তাহলে তো বিভিন্ন রাস্তার এপার্টমেন্ট ভবন থেকে ওরা লাখ লাখ টাকা  পায়। ভালোই ব্যবসা ফেঁদেছে ওরা।
২য় ফ্ল্যাট মালিক: আরো শুনবেন? কম উন্নত এলাকার বস্তিবাসীদের কাছ থেকে নিজ নিজ এলাকার গডফাদাররা ৪০ টাকা হারে চাঁদা তুলতেও দ্বিধা করে না।
১ম ফ্ল্যাট মালিক: আচ্ছা ভাই, একটা সহজ হিসাবের ব্যাখ্যা দিন তো। আমরা পাশাপাশি মাত্র দুটো এপার্টমেন্ট ভবন থেকে একত্রে যে প্রায় ৫ হাজার টাকা চাঁদা দিই, সেই টাকা দিয়ে তো আমরা নিজেরাই ক্লীনার রেখে বর্জ্য অপসারণ করাতে পারি। তাকে দিয়ে সারাদিন অন্য কাজ কর্ম করানো যায়। তাহলে আমরা সেটা করছি না কেন?
এ পর্যায়ে ২য় ফ্ল্যাট মালিক ঠোঁটের ওপর আঙ্গুল দিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন, চুপ করেন ভাই, চুপ করেন। আমাদের চাঁদা যেসব গডফাদারের হাতে যায় তারা একথা শুনলে আপনার কপালে দুঃখ আছে। তার চেয়ে চলেন কেটে পড়ি। সিস্টেম যেটা দাঁড়িয়ে গেছে তা পাল্টানোর সাধ্য আছে কার? এই বলে তিনি প্রতিবেশী ফ্ল্যাট মালিকের হাত ধরে অনেকটা হন হন করে নিজেদের এপার্টমেন্টের দিকে টেনে নিয়ে গেলেন। সড়কের পাশে পড়ে থাকা বর্জ্য ভর্তি তিনটা বস্তা এতোক্ষণ গভীর মনোযোগ সহকারে দুই ফ্ল্যাট মালিকের কথা-বার্তা শুনছিল। হঠাৎ তারা সম্বিত ফিরে পেল। তারা খেয়াল করল সড়কের পুরোটা আলোয় আলোয় উদ্ভাসিত। তিনটি বস্তার মধ্যে ১টি চটের বস্তা আলাদাভাবে এবং বাকি দু’টো সাদা প্লাস্টিকের বস্তা পাশাপাশি পড়ে ছিল। এর মধ্যে চটের বস্তাটি মৌনতা ভঙ্গ করল। সে বলে উঠল, ‘ভাই প্লাস্টিকের বস্তা, ধামন্ডিবাসী আর কখনো এত আলো দেখেনি। আমাদেরও কী সৌভাগ্য, আলোর বন্যা অবলোকনের সুযোগ হলো। মেয়র সাহেবকে সালাম, তিনি আলোয়-আলোয় ভরিয়ে দিলেন এলাকা।’ সাদা প্লাস্টিকের বস্তার মধ্যে ১টি ছিল লম্বাটে। কোনোরকম ভাঁজ পড়েনি বস্তায়। অপরটি গোলগাল। মানে বস্তাটি ছিঁড়ে ভেতরে কিছু ঢুকিয়ে সেলাই করে দেয়া হয়েছে। অনেকটা পেট ফোলা আকৃতির। সঙ্গে একটি লিচুর ঝুড়ি বাঁধা রয়েছে।
এবার পেট মোটা প্লাস্টিকের বস্তা হায় হায় করে উঠল। বলল, কী বলছ ভাই চটের বস্তা। বেশি আলোর কারণে তো মেয়র সাহেবের মাথা কাটা যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কারণ সবাই এখন আমাদের দেখতে পাবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ মেয়র সাহেবের সুনাম বিনষ্ট করে ছাড়বে।
ইত্যবসরে ভৈরব টাওয়ারের দুজন বাসিন্দা বাসায় ঢোকার মুহূর্তে একটু সময়ের জন্য তাদের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে সদ্য সংস্থাপিত ডিএসসিসি’র ফ্লাড লাইটে’র প্রশংসা করে সড়কের নোংরা দৃশ্য দেখে দুঃখ প্রকাশ করলেন। একজন মন্তব্য করলেন, এই দুরবস্থার জন্য ডিএসসিসি’র ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের’ দায়ী কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করা উচিৎ। নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মেয়রের সাফল্যকে ছোট করার জন্য রাস্তা ঝাড়ুদান কার্যক্রমে হেলাফেলা করেছেন।
অপর বাসিন্দা এ পর্যায়ে নিজের মতামত বক্তব্য করলেন। তিনি বললেন, সিটি করপোরেশনকে বারবার ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি’ যুগোপযোগী করার ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হলেও তারা তা আমলে নেয় না। অনেককে এ ব্যাপারে ছড়া কেটে বলতে শোনা যায়, ‘কানে দিয়েছি তুলো, আর পিঠে বেঁধেছি কুলো।’ তিনি আরো বলেন, পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্যকে দুভাবে ভাগ করে রাখায় ঝাড়ুদাররা শুধু নয়, ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে বর্জ্য অপসারণকারী শ্রমিকরাও অমুক বর্জ্য নেয়া যাবে না, ‘তমুক বর্জ্য’ আপনারা ফেলে আসুন’ বলার ম্পর্ধা  দেখায়। তাহলে কী ফ্ল্যাট মালিকদের নতুন করে আরো একদল ‘গডফাদারকে’ বাড়তি হারে  চাঁদা পরিশোধ করতে হবে? এই বলে তারা এপার্টমেন্টের ভেতরে চলে গেলেন। তাই না দেখে, লম্বা প্লাস্টিকের বস্তার মুখে এবার কথা ফুটল। বলল, এতদিনে বুঝলাম ছালার বস্তা ভাই... ঝাড়ুদার ও শ্রমিকরা কেন ছোট্ট তিনটি বস্তা তুলে নিয়ে সড়ক পরিষ্কার রাখার মহান দায়িত্বটুকু পালন করে না। তার কথায় বাকি দু’টি বস্তা সায় দিয়ে বলে উঠল, ঠিক বলেছো ভাই, সব দোষ ওই ডিসিসি’র।


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি