ঢাকা, মঙ্গলবার ২৭ জুন ২০১৭  ,
১৮:৫১:০০ জুন  ১৭, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই

Image

মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি
লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সাবেক মন্ত্রী বাণিজ্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

(পূর্ব প্রকাশের পর)
৭) বঙ্গবন্ধুর ‘‘স্বাধীনতার ঘোষণা” সম্বলিত টেলিগ্রাম পেয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা বিভিন্ন মাধ্যমে সে নির্দেশ বিভিন্ন বাহিনী/সংস্থা এবং সকল স্তরের জনগণের নিকট পৌঁছে দেন এবং পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙ্গালী জাতির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। একই ধারায় ২৬শে মার্চ বিকেল এবং ২৭শে মার্চ সকালে চট্টগ্রামের কালুর ঘাট অস্থায়ী বেতার কেন্দ  থেকে চট্টগ্রাম জিলা আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। ২৭ মার্চ বিকেল এবং ২৮ মার্চ সকালে তৎকালীন ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সহ অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানও বঙ্গবন্ধুর ২৬শে মার্চ ৭১ এ প্রচারিত স্বাধীনতার ঘোষণার নির্দেশের আলোকে এবং চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের অনুরোধে কালুর ঘাট বেতার কেন্দ  থেকে পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন যা ছিল নিম্নরুপ :
“The Government of the Sovereign State of Bangladesh on behalf of our Great Leader, the Supreme Commander of Bangladesh Sheikh Mujibur Rahman. We hereby proclaim the independence of Bangladesh and that the Government headed by Sheikh Mujibur Rahman has already been formed. It is further proclaimed that Sheikh Mujibur is the sole leader of the elected representatives of Seventy Five Million People of Bangladesh, and the Government headed by him is the only legitimate government of the people of the Independent  Sovereign State of Bangladesh, which is legally and constitutionally formed, and is worthy of being recognized by all the governments of the World. I therefore, appeal on behalf of our Great Leader Sheikh Mujibur Rahman to the Governments of all the democratic countries of the World, specially the Big Powers and the neighboring countries to recognize the legal government of Bangladesh and take effective steps to stop immediately the awful genocide that has been carried on by the army of occupation from Pakistan..............the legally elected representatives of the majority of the people ................... The guiding principle of a new state will be first neutrality, second peace and third friendship to all and enmity  to none. May Allah help us. Joy Bangla”  (মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস, মেজর জেনারেল এম এস ভূইঁয়া) । মেজর জিয়া কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ চট্টগ্রাম অঞ্চলের সশস্ত্র বাহিনীর অফিসার এবং জওয়ানদের মধ্যে সাহসের সঞ্চার করেছিল এবং মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এ সবই ঐতিহাসিক সত্য। সুতরাং স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই।
৮) জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্রিগেড অধিনায়ক, সহকারী সেনা প্রধান ছিলেন। ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মুসতাক সরকার তাকে সেনা প্রধান নিযুক্ত করেন। ১৯৭৫ এর শেষে দেশে সামরিক শাসন জারী হলে তিনি প্রথমে সহকারী প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। শেষে তিনি ‘গণ ভোটের’ মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৮১তে এক ব্যর্থ সামরিক অভুত্থানে নিহত হন। তার জীবদ্দশায় তিনি স্বাধীনতার ইতিহাস, জাতির জনক, স্বাধীনতার ঘোষক ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কোন বিতর্কের সৃষ্টি করেন নাই বরং ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ ‘‘দৈনিক বাংলা” পত্রিকায় তার লিখিত ‘‘একটি জাতির জন্ম” প্রবন্ধে তিনি বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক, স্বাধীনতার স্থপতি, স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে তার মতামত ব্যক্ত করেছিলেন। অবাক লাগে জেনারেল জিয়া নিজে যা স্পষ্টভাবে লিখে এবং বিশ্বাস করে গেছেন, তার আদর্শে প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি আজ তা অস্বীকার করে জাতিকে বিভ্রান্ত করছে এবং জেনারেল জিয়াকেও বিতর্কিত করেছে।
৯) আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই এ যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের জনগণ এবং ১৯৭০ এ নির্বাচিত সংসদ সদস্যবৃন্দ ১৭ই এপ্রিল ৭১ এ যে প্রবাসী সরকার গঠন করেন তাতে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত করা হয় এবং তার নেতৃত্বেই এ সরকারের সকল কর্মকান্ড এবং মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় যা ঐতিহাসিক সত্য। আমাদের ‘‘স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে”ও (যা আমাদের সংবিধানের একটি অংশ) ২৬শে মার্চ ৭১ এ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঢাকায় স্বাধীনতা ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের কথা দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রের অংশ বিশেষ উদ্ধৃত করছি-  ‘‘যেহেতু ১৯৭০ সনের ৭ই ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সনের ১৭ জানুয়ারী পর্যন্ত একটি শাসনতন্ত্র রচনার অভিপ্রায়ে প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্যে বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ তাঁদের ১৬৯ জন প্রতিনিধির মধ্যে ১৬৭ জনই আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত করেছিলেন এবং যেহেতু জেনারেল ইয়াহিয়া খান একটি শাসনতন্ত্র  রচনার জন্যে ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহ্বান করেন এবং যেহেতু আহুত এ পরিষদ স্বেচ্ছাচার ও বেআইনীভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্যে স্থগিত ঘোষণা করা হয় এবং যেহেতু পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী তাদের প্রতিশ্র“তি পালনের পরিবর্তে বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলাকালে একটি অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং যেহেতু  উল্লেখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভুত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে  বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার  অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের অখন্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্যে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান.............” (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিল পত্র)।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মরহুম ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ ১৯৯৫ সালের ২৬শে মার্চ দৈনিক বাংলা বাজার পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন ‘বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষণাকারী হিসেবে অস্বীকার করা সংবিধান লংঘন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র স্বাধীন বাংলাদেশের মূলভিত্তি। একে শুধু সংবিধানের অংশ বললে খাটো করে দেখা হবে। মূলতঃ এই ঘোষণাপত্রকে অস্বীকার করা স্বাধীন বাংলাদেশকে অস্বীকার করার সামিল। ঘোষণা পত্রে স্পষ্টভাবে লেখা আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক। এই ঘোষণা অস্বীকার করা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে অবমাননার তুল্য। এটি একটি দন্ডনীয় অপরাধ। ‘‘সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন একইভাবে বলেছেন ‘‘বঙ্গবন্ধুই যে স্বাধীনতার ঘোষক এ সত্য সাংবিধানিক, এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। এটা কেউ অস্বীকার করলে বাংলাদেশ দন্ডবিধির ১২৩ক(১) অনুসারে তার জরিমানাসহ ১০ বছর কারাদন্ড হতে পারে।” ১০) ১৯৭৫ এ গৃহিত আমাদের সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর ৩৪ (খ) অনুচ্ছেদে বঙ্গবন্ধুকে ‘‘জাতির পিতা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৭৫ হতে আজ পর্যন্ত অনেকগুলো নির্বাচিত, অনির্বাচিত এবং সামরিক সরকার এবং নির্বাচিত জাতিয় সংসদ গঠিত হয়েছে। এ সব সরকার জাতীয় সংসদের মাধ্যমে আমাদের সংবিধানে পঞ্চম থেকে চতুর্দশ অর্থাৎ দশটি সংশোধনী এনেছেন। এ সব সংশোধনীর মাধ্যমে ৪র্থ সংশোধনীর অনেক বিধানই রহিত করা হলেও ৩৪ (খ) অনুচ্ছেদে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে উল্লেখ করার বিধান রহিত করা হয় নাই। এ রহিত না করার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে ১৯৭৫ থেকে আজ পর্যন্ত সকল সরকার এবং জাতিয় সংসদ বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকার করেছেন।
১১) সরকারীভাবে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা ও মুদ্রণ এবং এ সংক্রান্ত দলিলপত্র সংরক্ষণের জন্য ১৯৭৮ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় ‘‘মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাস লিখন এবং মুদ্রণ” নামক একটি প্রকল্প গ্রহণ করেন। নয় সদস্য বিশিষ্ট এ কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রো ভাইস চ্যান্সেলার প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রফেসর মফিজুল্লাহ কবির এবং সদস্য সচিব ছিলেন জনাব হাসান হাফিজুর রহমান। গবেষণা শেষে সরকার কর্তৃক ১৯৮২’র নভেম্বর মাসে ‘‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিল পত্র” নামে ইতিহাস ষোল খন্ডে প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ জেনারেল জিয়াউর রহমানের সময় থেকে শুরু করে জেনারেল এরশাদের সময় পর্যন্ত এ প্রকল্পের কার্যক্রম অব্যাহত থাকার পর এ ইতিহাস প্রকাশিত হয়। এ দলিলেও বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক এবং স্বাধীনতার ঘোষক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
১২) ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কখনও প্রধানমন্ত্রী এবং কখনও রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যগণ বক্তব্য রেখেছেন। তাঁদের সকলেই বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক এবং স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ১৯৭২ এ আমাদের সংবিধান প্রণীত হয় এবং ০৪ নভেম্বর ১৯৭২ তা তৎকালীন গণপরিষদ কর্তৃক গৃহিত হয়। এ সংবিধান পাশ করা উপলক্ষে দেয় বিভিন্ন সংসদ সদস্যদের ভাষণও আমি সংসদ পাঠাগারে পড়েছি। তারা বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক এবং স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আমি আশা করি উপরোক্ত এক ডজন তথ্য পাঠের পর আর কেউ বাঙ্গালী জাতির জনক, স্বাধীনতার ঘোষক ইত্যাদি বিষয়ে অযথা অসত্য বিতর্কে জড়াবেন না ।
আমাদের গর্বের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে আজ ৪৫ বছর। স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক কারো কাম্য নয়। এ কথা সবারই জানা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক এবং অভিন্ন। একে আলাদা করার কোন উপায় বা পথ নেই। যতদিন পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের দেশটি থাকবে ততদিন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামটিও জড়িত থাকবে। এটা কোন কাঠ পেন্সিলের লেখা নয়, যে রাবার দিয়ে মুছে ফেলা যায় বা যাবে। আজ যারা ইতিহাস বিকৃতির মত জঘন্য কাজে লিপ্ত তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, ইংরেজরাও এক সময় নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে নানা অপবাদ দিয়েছিল, জনগণের কাছে হেয় করতে চেয়েছিল, তার দেশপ্রেমকে অবজ্ঞা করতে চেয়েছিল- কিন্তু পারে নাই। সিরাজ উদ দৌলা সমহিমায় জনগণের হৃদয়ে এবং ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছেন। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠিও এ দেশের অনেক দেশপ্রেমিক ত্যাগী নেতাকে সন্ত্রাসী, দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়েছিল কিন্তু তাদের কুচক্রান্তও সফল হয় নাই। তেমনি আজও যারা বঙ্গবন্ধুকে,  আমাদের স্বাধীনতাকে, স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিতর্কিত করতে চায়, দেশপ্রেমিক ত্যাগী নেতাদের দেশদ্রোহী আখ্যা দেয় তারা কোন দিন সফল হতে পারে নাই, পারবে না। ইতিহাস সত্য বলবেই। বীর বাঙ্গালী জাতি সত্য থেকে বিচ্যুত হবে না। চলুন আমরা সকলে বাংলাদেশ এবং বাঙ্গালী জাতির সঠিক ইতিহাস রক্ষা করি। বিকৃত ইতিহাসের হাত থেকে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা করি। (সমাপ্ত)                                                                                                                                                                                                                    


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি