ঢাকা, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭  ,
১৮:৪৭:৪৪ জুন  ১৭, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


মডেল সিটি গাজীপুর এবং উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন

Image

শতাব্দী আলম
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

‘মডেল সিটি গাজীপুর’ শুনলে অনেকেরই চোখ কপালে উঠবে। কারণ ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর ছাড়াও চট্টগ্রাম, বরিশাল বা খুলনা সিটি হিসাবে সময়ের পরিক্রমায় অনেক পুরাতন। সেই বিচারে গাজীপুর সিটির বয়স মাত্র চার বছর। প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে ওইসব বাদ দিয়ে গাজীপুর মডেল সিটি কেন হবে? কিন্তু নতুন সিটি হলেও অর্থনৈতিক, অবকাঠামো এবং আয়তনের বিবেচনায় গাজীপুর সিটি করপোরেশনই বাংলাদেশের মডেল সিটি হচ্ছে। এটাই সরকারের বর্তমান রূপরেখা।
‘উন্নত বাংলাদেশ’ শিল্পোন্নত গাজীপুরকে কেন্দ  করেই জাগ্রত হবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম বা খুলনাকে নতুন করে গড়ার আর সুযোগ নেই। এসব সিটিতে ঘষামাজা করে সৌন্দর্যবর্ধন বা অবকাঠামোর আকার পরিবর্তন করা ছাড়া কোন কাজ নেই। যতই দিন গড়ায় ওইসব নগরী ঘিঞ্জি থেকে ঘিঞ্জিতর হচ্ছে। আর গাজীপুর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ‘উন্নয়নের রাজধানী’। শেখ হাসিনা সরকারের ভিশন ২০৪১ সালের প্রধানতম লক্ষ্য হচ্ছে উন্নত বাংলাদেশ। সেজন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি উন্নত নগর ব্যবস্থাপনাও থাকতে হবে। রাজধানীর আশপাশে গাজীপুরই সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। প্রাকৃতিকভাবেই গাজীপুর বন্যামুক্ত এলাকা। উল্লেখ্য ইতোমধ্যে সরকার যে পূর্বাচল সিটি গড়ে তুলছে তার সিংহভাগই গাজীপুর জেলায়। দেশের সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পোশাক শিল্পের কেন্দ স্থল এই গাজীপুর। পাশাপাশি ৩২৯ বর্গকিলোমিটার গাজীপুর সিটিতে সবুজ বন ও বিস্তীর্ণ খোলা আকাশ বিদ্যমান। এখনো চাইলেই মনের মত করে একটি আদর্শ নগরী হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকে মাত্র দশ মিনিটের ব্যবধানেই দেখা মিলবে ঘন সবুজ বন আর খোলা আকাশ। বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্ক, রাজেন্দ পুর ক্যান্টনমেন্ট, সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কারখানা মিলে এখনো ৫০ বর্গকিলোমিটার ভুমিও উন্নয়ন অঞ্চলের আওতাভুক্ত হয়নি। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান এই নগরের গর্ব। সব রক্ষা করেও প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে একটি আদর্শ (মডেল) নগর হতে পারে গাজীপুর। গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও সরকার সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি আদর্শ নগর হিসাবে গাজীপুরকে গড়ে তুলার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে।
২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যআয়ের দেশে রূপান্তর করতে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার। পদ্মা বহুমুখী সেতু, মেট্রোরেল, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ , মৈত্রী সুপার থারমাল বিদ্যুৎ কেন্দ , এলএনজি টার্মিনাল, পায়রা সমুদ্রবন্দর, পদ্মা রেল সেতু সংযোগ, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিশ্বের সর্ববৃহৎ মেরিন ড্রাইভ রোড, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ , মহাখালী থেকে জয়দেবপুর চৌরস্তা পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে উল্লেখযোগ্য। গাজীপুরের সাথে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার লক্ষ্যে মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন। বিশ্বের তৈরি পোশাকখাতে চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তৈরী পোশাকশিল্পের সিংহভাগ কারখানাই গাজীপুরে অবস্থিত। বাস্তবতার নিরিখেই গাজীপুরের সাথে দেশের অন্যান্য নগরের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ ও দ্রুততর করার প্রক্রিয়া চলমান। ঢাকা বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম, মংলা এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্র্ণ। উৎপাদিত তৈরি পোশাক ক্রেতার চাহিদামাফিক সময়মত বিদেশে রপ্তানি করতে হয়। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হলে খুব সহজেই পোশাকের কন্টেইনার কার্গো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌছাবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন হওয়ায় কার্গো পরিবহনেও সুবিধা হচ্ছে। পদ্মাসেতু প্রকল্প চালু হলে মংলা সমুদ্রবন্দরের সাথে গাজীপুরের যোগাযোগে বিপ্লব ঘটবে। ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসাবে আসাদুর রহমান কিরন সময়োপযোগী উন্নয়ন-প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিয়েছেন। গাজীপুরে তৈরি পোশাক কারখানা গড়ে ওঠার পেছনে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দেরও যথেষ্ট সহযোগিতা রয়েছে। গণমাধ্যমে প্রায়ই আসে দেশের বিভিন্ন স্থানে কারখানা বা ঘরবাড়ি নির্মাণ করতে সন্ত্রাসী গোষ্ঠি বা প্রভাবশালীদের ভরণ-তোষণ করতে হয়। কিন্তু গাজীপুরের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে কারখানা স্থাপনে তেমন কোন সমস্যা নেই বললেই চলে। শিল্প অধ্যুষিত টঙ্গী-জয়দেবপুর এলাকার সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল অত্যন্ত সৎ এবং নিষ্ঠাবান রাজনীতিক হিসাবে আলোচিত। শিল্প কারখানায় এলাকার বেকার শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থান হওয়ার বিষয়কেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন। স্থানীয় সাংসদের সহযোগিতার কারণে গাজীপুরে গত দশ বছর গাণিতিকহারে কারখানার সংখ্যা বেড়েছে।
সরকারি হিসাবে গাজীপুরে প্রায় দুই হাজার তৈরি পোশাক কারখানা আছে। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হবে। তাছাড়া টঙ্গী বিসিক ও কোনাবাড়ি বিসিকে রয়েছে প্রায় চারশ’ কারখানা। কারখানা মানেই বিশাল বিশাল ভবন। এসব ভবন রাতারাতি তৈরি হয়নি। একটি আটতলা ভবন নির্মাণ সম্পন্ন করতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগে। সেই ভবনে যন্ত্রপাতি সংযোজনশেষে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যেতে আরও বছর সময় পার হয়। উৎপাদন শুরু হওয়া থেকে পরবর্তী সিকি-শতাব্দী অনায়েশেই ওই ভবনে উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব। ক্রেতা সংগঠন অ্যাকর্ড অ্যালায়েন্সের কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট প্রাপ্ত হলে এসব ভবনে ৫০ বছর উৎপাদন চালাতেও সমস্যা নেই। এসব ইট পাথরের দেয়ালে উন্নত বাংলাদেশের বীজ বপন করা শেষ। এখন শিল্পোৎপাদনের মাধ্যমে ফসল ঘরে তুলতে হবে। 
উন্নয়নের প্রথম শর্ত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি নাগরিকের সুশিক্ষা নিশ্চিত করা। শিক্ষার উন্নয়নে সরকার যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সম্প্রতি দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি সরকারি কলেজ নীতিমালা অনুযায়ী নতুন করে ২৮৭টি কলেজ সরকারি হয়েছে। সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে জোর দেয়ার ফলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে। উন্নয়নের গতিপথ সচল রাখতে প্রয়োজন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ। তিনটি ক্ষেত্রেই গাজীপুরে স্থিতিশীলতা আছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গাজীপুরই এখন সবচেয়ে উর্বর ও প্রস্তুত একটি মডেল অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরিতে। কিন্তু সে তুলনায় সরকারিভাবে গাজীপুরের উন্নয়ন বরাদ্দ অপ্রতুল। যেখানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির উন্নয়ন বরাদ্দ পাঁচ থেকে সাতশ’ কোটি টাকা। সেখানে গাজীপুরের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ছেষট্টি কোটি টাকা। উৎপাদনমুখী শিল্প আরও বেগবান করতে হলে গাজীপুর সিটির উপর বিশেষ নজর দিতে হবে। গাজীপুরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, গ্যাস সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া উচিৎ।  
টঙ্গী ব্রীজ থেকে গাজীপুর মহানগরের অভ্যন্তরে ঢাকা-ময়মনসিংহ রোড ধরে এগুলে দুই দিকে চোখে পড়বে সারি সারি কারখানাভবন। তবে সিংহভাগ কারখানাই গাজীপুর মহানগরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সাতাইশ, আউচপাড়া, গাছা, বাসন, পুবাইল, পাগাড়, মাছিমপুর, জয়দেবপুর, কাশিমপুর, কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, কড্ডা, বড়বাড়ি, মাষ্টারবাড়ি, বোর্ডবাজার, চন্দ্রা এলাকায় অসংখ্য কারখানা আছে। এসব কারখানা থেকে মহাসড়কের সাথে সংযোগ সড়কের ভগ্নদশা ছিল। গত আড়াই বছরে এসব সড়কের ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়েছে। বিশেষকরে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসাবে দায়িত্ব নিয়ে আসাদুর রহমান কিরন এসব উন্নয়ন কাজ করেন। গাজীপুর সিটির পাঁচটি জোনে প্রায় ছয়শ’ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। সিটির নিজস্ব অর্থায়ন, সরকারি বরাদ্দ ও বিদেশী দাতাসংস্থার অনুদানে এসব উন্নয়ন-কর্ম হচ্ছে। লক্ষ্যণীয় হচ্ছে, বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে আমরা দেখি রাস্তা নির্মাণ করা হয় খুবই দূর্বলভাবে যাতে ছয় মাস বা বছর গেলেই সংস্কারের নামে লুটপাট করা যায়। গাজীপুর সিটিতে রাস্তাগুলো খুবই টেকসইভাবে নির্মাণ হয়েছে। পাথর, সিমেন্ট ও রড দিয়ে একফুট পুরো ঢালাই দেওয়া। আগামী পঞ্চাশ বছরেও এই রাস্তা ভাঙবে না। রাস্তার সাথে পানি নিষ্কাশনের নালাও ঢালাই দিয়ে মজবুত করা হয়েছে। প্রতিটি রাস্তা কমপক্ষে ত্রিশফুট প্রশস্ত করা। গাজীপুরা থেকে সাতাইশ চৌরাস্তা হয়ে গুটিয়া পর্যন্ত রাস্তা। চেরাগ আলী থেকে ভাদাম মদিনা ডায়িং কারখানা পর্যন্ত রাস্তা। টঙ্গী সরকারি কলেজ থেকে দেওড়া রোড। মিলগেট থেকে অলম্পিয়া কারখানা রোড। টিএন্ডটি থেকে পুবাইল রোড। টঙ্গী বিসিকের ভিতর দিয়ে পাগাড় পাঠানপাড়া রোড। কাজিমুদ্দিন চৌধুরী স্কুল এন্ড কলেজ রোড। ভাওয়াল বদরে আলম কলেজ বাইপাস রোড। দীঘিরচালা টাঙ্গাইল মহাসড়ক রোড। একাজউদ্দিন মুন্সি সড়ক। বাসন-ইসলামপুর হক মার্কেট সড়ক। এসব সড়কগুলো আরসিসি ঢালাই দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন টেকসই করে বানানো হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত মেয়র জানালেন, স্থায়ীভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। ইতোমধ্যে একটি বেসরকারি সংস্থার সাথে চুক্তিভিত্তিক প্রকল্প সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। বর্জ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। 
নগর বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বিশাল আয়তনের গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সিকিভাগও এখনো উন্নয়নের আওতায় আসেনি। শুধুমাত্র টঙ্গী, পুবাইল, বাসন, কোনবাড়ি, জয়দেবপুরে সড়কবাতি লাগানো হয়েছে। ৯০ ভাগ এলাকাতেই এখনো সড়কবাতি লাগানো হয়নি। পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ব্যবস্থারও বেহাল দশা। সিটি করপোরেশনের অধিকাংশ এলাকায় পানি সরবরাহ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। কিন্তু সকল এলাকার বাসিন্দাদের সমানহারেই হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করতে হচ্ছে। গাজীপুৃরকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে নতুন করে সাজানোর সুযোগ আছে। এজন্য সেবাসংস্থা তিতাস গ্যাস কোম্পানী, বিদ্যুৎ বিভাগ ও স্থানীয় সরকারের সাথে সিটি করপোরেশনের সমন্বয় থাকতে হবে। সব সেবা সংস্থাকে নিয়ে একটি মাষ্টার প্ল্যান করতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বে তা বাস্তবায়িত হতে থাকবে। গড়ে উঠবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের উন্নত বাংলাদেশ।


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি