ঢাকা, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭  ,
০৯:৫৪:৫৩ মে  ২৪, ২০১৭ - বিভাগ: স্বাস্থ্য


কলেরা হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগী বাড়ছে

Image

বেলা আড়াইটা, মঙ্গলবার। রাজধানীর মহাখালিতে কলেরা হাসপাতালের সামনে বসে আছেন মোস্তফা রহমান। তিনি রাজধানীর মানিকনগরের বাসিন্দা। মঙ্গলবার সাড়ে ১১টার দিকে সাত মাসের ছেলে আলভি রহমানকে নিয়ে এসেছেন। তিনদিন ধরে ছেলের পাতলা পায়খানা হচ্ছে।


তিনি জানান, প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ বার ছেলের পাতলা পায়খানা হয়েছে। তাই চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন।

শুধু মোস্তফা রহমান নন, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত আরো অনেক রোগীর স্বজনরা বসে আছেন হাসপাতালের বাইরে।

মোহাম্মদপুরের নুরজাহান রোড থেকে আসা মুনির হোসেন জানান, তিনিও সকালে এসেছেন তার ৪ মাস ৫ দিন বয়সী ছেলেকে নিয়ে। তিনদিন আগে তার ছেলে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে।

কলেরা হাসপাতাল সূত্র জানায়, মঙ্গলবার (২৩ মে) সকাল থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৬১ জন রোগী। ২২ মে সোমবার ভর্তি হয়েছেন ৫৫২ জন, তার আগে ২১ মে রোববার ভর্তি হন ৫৩৭ জন।

কলেরা হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক নাহার খাতুন মঙ্গলবার জানান, সকাল থেকে রোগী ভর্তি হচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মানুষ মূলত বিশুদ্ধ পানির সংকটে থাকে। তারাই সাধারণত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।’

চিকিৎসকরা বলছেন, বিশুদ্ধ পানির অভাবেই এই গরমে মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। মানুষ গরমে অনেক বেশি পানি পান করেন। আগে এক গ্লাস পান করতেন, তাতে যে জীবাণু থাকতো তা দেহকে কাবু করতে পারতো না। আর এখন গরমে ওই ব্যক্তি দুই গ্লাস পানি পান করছেন। ফলে জীবাণু তার দেহে বেশি প্রবেশ করছে। দেহ এই দ্বিগুন জীবাণু প্রতিরোধ করতে না পারায় মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।’

স্বাস্থ্য অধিপ্তরের তথ্য মতে, ২০ জেলায় ২২ মে ৯৫৮ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। গত এক সপ্তাহে আক্রান্ত হয়েছে তিন হাজার ৭৬৪ জন। আর গত একমাসে আক্রান্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৪৯৩ জন। এছাড়া ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২২ মে পর্যন্ত সারাদেশে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪০৩ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। এ বছর এখন পর্যন্ত ডায়রিয়ায় মারা গেছে তিনজন। এরমধ্যে দু’জন ঠাকুরগাঁ জেলায় ও একজন সিলেট জেলায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. একেএম মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ডায়রিয়া হচ্ছে পানিবাহিত রোগ। পানির মাধ্যমে ডায়রিয়ার জীবাণু ছড়ায়। দিনে দু’বারের বেশি পাতলা পায়খানা হলে তাকে ডায়রিয়া বলা হয়। ডায়রিয়া ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া দিয়ে হতে পারে। পানির সমস্যার কারণে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তারা বিশুদ্ধ পানি পান না করার কারণে আক্রান্ত হচ্ছেন। রাস্তার পাশে আখের রস, জুস, শরবত, বিভিন্ন পানীয় মানুষ খাচ্ছেন। এগুলো থেকেও জীবাণু ছড়াচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘পিপাসা নিবারণের জন্য যেখানে সেখানে পানি পান না করাই উত্তম। ডায়রিয়া যখন ছড়ায় তখন ডায়রিয়ার পাশাপাশি অন্য পানিবাহিত রোগগুলোও ছড়ায়। জন্ডিস, টাইফয়েড জ্বর এগুলোও হয়। কাজেই ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব আমাদের একটু সিরিয়াস ভাবেই নিতে হবে।’

ডায়রিয়া হলে করণীয় সম্পর্কে এই চিকিৎসক বলেন, ‘ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে প্রথম কাজ হচ্ছে প্রচুর পরিমান স্যালাইন খাওয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত পানির পিপাসা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত স্যালাইন খেয়ে যেতে হবে। যদি দেখা যায় যে, কেউ স্যালাইন খেয়ে রাখতে পারছেন না, তার প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেছে তখন বুঝতে হবে তার কিডনি বিকল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে তাকে শরীরে স্যালাইন নিতে হবে। ডায়রিয়ার সাথে কারো যদি জ্বর থাকে এবং ব্যথা থাকে তাহলে তাকে এন্টিবায়োটিক দিতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘পায়খানার সাথে যদি রক্ত যায় তখন বুঝতে হবে যে, রক্ত আমাশয়। সে ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো সিরিয়াস ভাবে নিতে হবে। সব রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার দরকার পড়ে না। পায়খানার সঙ্গে যাদের বমি হবে তাদের হাসপাতালে নিতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশুরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেলা আখতার বলেন, ‘শিশুরা ভাইরাস দ্বারা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। এতে তাদের শরীরের পানি আর লবণ চলে যায়। তাই খাবার স্যালাইন খেতে হবে যথেষ্ট পরিমানে। তাদের শরীরে পানি এবং লবণের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। যেহেতু ভাইরাস তাই ওষুধ লাগে না। ছয়মাস বয়সী শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। বুকের দুধ খাওয়ানো বাদ দেওয়া যাবে না। সেই সাথে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ডায়রিয়া যাতে না হয় সেজন্য বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। সেক্ষেত্রে পানি ফুটিয়ে পান করতে হবে। অন্তত ১০ মিনিট টগবগ করে ফুটানো পানি ঠাণ্ডা করে খেতে হবে। শুধু খাওয়ার পানি বিশুদ্ধ হলে হবে না। অজু ও গোসলের পানিও বিশুদ্ধ হতে হবে। টয়লেট করার পর হাত ভাল করে সাবান দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। বাসায় যারা শিশুকে দেখভাল করবেন তাদের পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। নিয়মিত শিশুর আঙুলের নখ কেটে দিতে হবে।’

স্বাস্থ্য 'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি