ঢাকা, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭  ,
২১:৪৫:২৩ মার্চ  ২৭, ২০১৭ - বিভাগ: বিদ্যুৎ/জ্বালানি


চোরাই তেলের রমরমা ব্যবসা

Image

নিজস্ব প্রতিবেদক

সর্বত্র অবৈধভাবে জ্বালানি তেলের বিপজ্জনক ব্যবসা। ব্যবহারে কমে যাচ্ছে যানবাহনের আয়ুষ্কাল। বাড়ছে অবৈধ দোকানের সংখ্যা। ফলে নগরীর পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রাজধানীর প্রায় সর্বত্র অবৈধভাবে জ্বালানি তেলের বিপজ্জনক ব্যবসা জমে উঠেছে। বাড়ছে অবৈধ দোকানের সংখ্যাও। ফলে নগরীর পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব অবৈধ দোকানের জ্বালানি ব্যবহারে কমে যাচ্ছে যানবাহনের আয়ুষ্কালও। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঢাকায় ২১২টি পাম্পের জ্বালানি তেল বিক্রির বৈধ লাইসেন্স ও অনুমোদন রয়েছে। অথচ সব নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে প্রায় দেড় হাজার জ্বালানি তেল বা পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থ বিক্রির দোকান গড়ে উঠেছে। পেট্রোলিয়াম সংক্রান্ত আইন অনুসারে জ্বালানি তেল পেট্রোল-ডিজেলের ব্যবসার জন্য বিস্ফোরক পরিদফতরের পূর্ব অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। অথচ সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে, এমনকি কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই এসব প্রতিষ্ঠান এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর ধোলাইখাল এলাকাতেই এ ধরনের দোকান সর্বাধিক। রাজধানীর প্রধান তিন বাস টার্মিনাল গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ ও কমলাপুর রেল স্টেশন এবং সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ছাড়াও প্রতিটি বাসস্ট্যান্ড ও বড় রাস্তার পাশে এসব অস্থায়ী বা স্থায়ী দোকান গড়ে উঠেছে। এদিকে, গত ০৩ মার্চ খুলনায় ৩ হাজার ৪০ লিটার চোরাই তেল উদ্ধার করেছে র‌্যাব। এ ঘটনায় চার চোরাকারবারিকে গ্রেফতার করা হয়। র‌্যাব-৬’র লবণচরাস্থ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে ভোরে র‌্যাব খুলনার ভৈরব নদে এ অভিযান পরিচালনা করে। র‌্যাব জানায়, গোপন খবরের ভিত্তিতে র‌্যাবের একটি দল ভোর রাতে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি বাজার বান্দা ঘাট এবং ভৈরব নদের তীরবর্তী বার্মাশীল ঘাট এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় চারটি নৌকাসহ চোরাই ৩ হাজার ৪০ লিটার চোরাই তেল জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল ২ হাজার ৮শ’ লিটার এবং ২৪০ লিটার ফার্নেস ওয়েল। ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে চার জন কালোবাজারীকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছে- দিঘলিয়ার ফরমাইশ খানা গ্রামের শেখ লুৎফর রহমানের ছেলে মো. আক্তার হোসেন (৪২), একই গ্রামের শেখ আকরাম হোসেনের ছেলে শেখ মো. নাসিম উদ্দিন (২২), মো. আনোয়ার খানের ছেলে মো. আলামিন খান সুমন (২৯) ও মো. নজরুল খানের ছেলে মো. শিমুল খান (২২)।  র‌্যাবের সিপিসি স্পেশাল কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, একটি চোরাকারবারি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি তেল পাচার এবং চুরির সাথে জড়িত রয়েছে। তারা জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল চুরি করে ইঞ্জিন নৌকার তলায় রেখে  ক্যান ও ব্যারেলে করে তা বিক্রি করে থাকে। রাজধানীর বিভিন্ন দোকান মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, সরকারি যানবাহনের একশ্রেণির অসাধু চালক এসব অবৈধ দোকানের নিয়মিত তেল সরবরাহকারী। এসব অসাধু চালক বিভিন্ন সরকারি গাড়ির তেল এসব দোকানে বাইরের পেট্রোল পাম্পের চেয়ে ১০ থেকে ২০ টাকা কমে বিক্রি করে। এদের সাথে বেসরকারি কিছু গাড়ির ড্রাইভারও যুক্ত হয়ে তেল বিক্রি করে। বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম জাতীয় গাড়ির চালকরাও চুরি করে তেল দেয় এদের। এরপর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প থেকে সংগৃহীত এবং চোরা পথে আসা গ্যাস কনডেনসেট বা তলানিসহ অন্যান্য নিুমানের পদার্থ মিশিয়ে তেল বিক্রি করা হয়। ভাড়ায়চালিত মিশুক, প্রাইভেটকারসহ টাউন সার্ভিসের বাসগুলো এই তেলের প্রধান ক্রেতা। মোটরসাইকেল চালকদের কাছেও এ চোরাই তেলের বেশ কদর রয়েছে। আগে দুই স্ট্রোক বিশিষ্ট যানবাহন, যেমন টেম্পো, বেবিট্যাক্সি ছিল এ জ্বালানির মূল খদ্দের। তাছাড়া বাস, ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহনকেও প্রায়শই এদের কাছ থেকে তেল সংগ্রহ করতে দেখা যেতো। এসব দোকান থেকে তেল নেওয়ার আরেকটি কারণ হলো- ১ লিটার তেল কিনে ২ লিটারের রসিদ নিয়ে মালিককে সহজে বুঝিয়ে দেওয়া যায়। এসব নিুমানের ভেজাল তেল ব্যবহার করায় গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষতি তো হয়ই, এর কালো ধোঁয়া পরিবেশও দূষিত করে। এই তেলে যাত্রীদের চোখ জ্বলে এবং ইঞ্জিন থেকেও বেশি শব্দ হয়। এছাড়াও আপাত দৃষ্টিতে টাকার সাশ্রয় হচ্ছে মনে হলেও ভালো তেলের তুলনায় এসব ভেজাল চোরাই তেলে গাড়ির মাইলেজ কমে যায়। মিরপুর-১ নম্বরের তেল ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি প্রায় ৮ বছর ধরে চোরাই তেলের ব্যবসা করছেন। কখনো তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। টাকা না পেলেই শুধু মাঝে মধ্যে পুলিশ ঝামেলা করে। তেল ক্রয়কারী গাড়ির একাধিক চালক বলেন, দাম কিছুটা কম হওয়ায় এবং পেট্রোল পাম্পে ভিড় থাকায় বাধ্য হয়েই আমরা এই তেল নিই। এছাড়া পেট্রোল পাম্পগুলো হাতের নাগালে না থাকার কারণেও এ ধরনের দোকান থেকে তেল নিতে হয়। এদিকে বিগত কয়েক বছরের মধ্যে নগরীতে জ্বালানি তেলের এসব অবৈধ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের নজির নেই। উপরন্তু অনেক তেলের দোকান আবাসিক এলাকার মধ্যে গড়ে ওঠায় স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কের মধ্যে বাস করছেন। বিস্ফোরক অধিদফতরের প্রধান বিস্ফোরক কর্মকর্তা নূরুল আলম বলেন, কতটি জায়গায় এসব অবৈধ ও বিপজ্জনক ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে তার হিসাব রাখা কঠিন। তবে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি জ্বালানি তেলের অবৈধ ব্যবসা করছেন। আমরা অঅনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পেলে পুলিশকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিই। বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলহাজ নাজমুল হক বলেন, সারাদেশে ১ হাজার ৭৬টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। শুধু ঢাকাতেই রয়েছে ২১২টি। কিন্তু সমস্যা হলো- সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় দেড় হাজারের বেশি অবৈধ দোকান জ্বালানি তেলের ব্যবসায় নেমেছে। এদের ভেজাল তেলে গাড়ির আয়ুষ্কাল বিনষ্ট হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আমরা লিটারপ্রতি মাত্র ৬৫ পয়সা কমিশন পাই। এর মধ্যে আমাদের পরিচালনা বাবদ ব্যয় হয় ৪২ পয়সা। লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ২৩ পয়সা লাভ থাকে পেট্রোল পাম্প মালিকদের। অথচ ভেজাল মিশ্রিত তেল বিক্রি করে একদিকে যেমন অবৈধ ব্যবসায়ীরা অনুমোদিত তেল ব্যবসায়ীদের লোকসান করাচ্ছেন, তেমনি গাড়িরও ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছেন।


বিদ্যুৎ/জ্বালানি'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি