ঢাকা, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭  ,
২৩:৩৮:১১ ফেব্রুয়ারি  ২৮, ২০১৭ - বিভাগ: বিদ্যুৎ/জ্বালানি


সংকট সত্ত্বেও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি
গ্রাহকের কাঁধে অতিরিক্ত খরচের বোঝা

নিজস্ব প্রতিবেদক

একদিকে চলছে গ্যাস সংকট। আবাসিকে গ্যাস না থাকার ভোগান্তি, শিল্পে প্রয়োজনমতো গ্যাস না পাওয়ার হাহাকার। এর মধ্যেই আবারও গ্যাসের দাম বাড়াল সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দাম বৃদ্ধি বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করবে এবং জনগণের নিত্যদিনের খরচ বাড়িয়ে নাভিশ্বাস তুলবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই।
সরেজমিনে এবং বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে দিনে অন্তত টানা ৪ ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে রান্নার প্রচলিত সময়ে অর্থাৎ সকাল ৭টা থেকে ৯টা বা দুপুর ১২টা থেকে বেলা ২টায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক জায়গায় ২৪ ঘণ্টা গ্যাস থাকলেও চাপ কম হওয়ায় চুলা জ্বলে টিমটিম করে। গ্যাস স্বল্পতায় শিল্পাঞ্চলের অনেক কল-কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। শত শত কোটি টাকা খরচ করে কম্প্রেসার বসিয়েও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। কয়েক দফা গ্যাসের চাপ বাড়িয়ে অনুমোদন নিলেও কাক্সিক্ষত চাপে গ্যাস পাচ্ছে না কারখানাগুলোও। ফলে একদিকে শিল্প প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে চলছে। আবাসিক গ্রাহকদের কাঁধেও চেপেছে অতিরিক্ত খরচের বোঝা ও ভোগান্তি। দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ আবাসিক গ্যাস সংযোগ রয়েছে। আবাসিক ছাড়াও বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সিএনজি স্টেশনগুলো গ্যাস সংকটে ভুক্তভোগী। বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৩৪০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু গড় প্রাপ্তি ২৭০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি ৭০ কোটি ঘনফুট। ৮ ডিসেম্বর উৎপাদিত হয় ২৬৫ কোটি ৬৯ লাখ ঘনফুট গ্যাস। শীতে গ্যাসের চাহিদা গরমকালের চেয়ে দৈনিক ২০ থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট বাড়ে।
গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানীতে অপেক্ষাকৃত বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছে যেসব এলাকার মানুষ, তার মধ্যে রয়েছে মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ইন্দিরা রোড, গ্রিন রোড, কলাবাগান, শুক্রাবাদ, কাঁঠালবাগান, মোহাম্মদপুর, রাজাবাজার, মগবাজার, মালিবাগ, তেজকুনিপাড়া, পশ্চিম রামপুরা, বাসাবো, জুরাইন, আরামবাগ, আরকে মিশন রোড, টিকাটুলি, মিরহাজারিবাগ, যাত্রাবাড়ী, পোস্তগোলা, উত্তরা, জাফরাবাদ, লালবাগ, কেরানীগঞ্জ। তিতাস গ্যাসের জরুরি ফোন নম্বরে কল করে প্রতিদিনই গ্রাহকরা এ সংক্রান্ত অভিযোগ করছেন।
ঢাকাসহ আশপাশের অন্তত ১৪টি জেলায় গ্যাস বিতরণ করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (টিজিটিডিসিএল)। কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মসিউর রহমান বলেন, চাহিদার চেয়ে এমনিতেই আমরা গ্যাসের জোগান পাই কম। চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন সে অনুপাতে বাড়েনি।
গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ গ্যাসের দাম বাড়িয়েছিল বিইআরসি। তখন গড়ে ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়। এবার গড়ে ২২ দশমিক ৭৩ শতাংশ গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে বিইআরসির নতুন কমিটি। আবাসিক ও সিএনজিসহ সব ধরনের গ্যাসের দামই বাড়ানো হয়েছে। দুই ধাপে এই দাম কার্যকর হবে। প্রথম ধাপ আজ থেকে এবং দ্বিতীয় ধাপ ১ জুন থেকে।
মার্চ মাস থেকে এক চুলা ব্যবহারকারীদের ৬০০ টাকার পরিবর্তে ৭৫০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ৬৫০ টাকার পরিবর্তে ৮০০ টাকা দিতে হবে। জুন মাসে গিয়ে দিতে হবে এক চুলায় ৯০০ এবং দুই চুলায় ৯৫০ টাকা। এক চুলায় গড়ে বেড়েছে ৫০ শতাংশ এবং দুই চুলায় বেড়েছে ৪৬ শতাংশ। আবাসিকের মিটার ব্যবহারকারীদের প্রতি ঘনমিটার এখন দাম ৭ টাকা। এটা প্রথম ধাপে বাড়তি দিতে হবে ৯ টাকা ১০ পয়সা এবং দ্বিতীয় ধাপে ১১ টাকা ২০ টাকা। প্রতি ঘনমিটার সিএনজির দাম ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ১ মার্চ থেকে ৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৮ টাকা এবং ১ জুন থেকে ৪০ টাকা করা হয়েছে।
বিদ্যুতের ক্ষেত্রে বাড়ানো হয়েছে ১২ দশমিক ০৫ শতাংশ। প্রতি ঘনমিটারে ২ টাকা ৮২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ মার্চে ২ টাকা ৯৯ পয়সা এবং ১ জুন থেকে ৩ টাকা ১৬ পয়সা করা হয়েছে। ক্যাপটিভে বাড়ানো হয়েছে ১৫ দশমিক ০৭ শতাংশ। এক্ষেত্রে ৮ টাকা ৩৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ মার্চে ৮ টাকা ৯৮ পয়সা এবং ১ জুন থেকে ৯ টাকা ৬২ পয়সা।
সারে বাড়ানো হয়েছে ৫ দশমিক ০৩ শতাংশ। ১ মার্চ থেকে ২ টাকা ৫৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৬৪ পয়সা এবং ১ জুন থেকে ২ টাকা ৭ পয়সা। শিল্পে ১৫ দশমিক ১৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ১ মার্চ থেকে ৬ টাকা ৭৮ থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ২৪ পয়সা এবং ১ জুন থেকে ৭ টাকা ৭৬ পয়সা করা হয়েছে। চা-বাগানের ক্ষেত্রে ১৫ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং বাণিজ্যিকে ৫০ শতাংশ গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের সাথে জড়িতরা বলছেন, পেট্রোবাংলাসহ গ্যাস বিক্রেতা সরকারি কোম্পানিগুলোর প্রায় সবগুলোই মুনাফা করছে। পেট্রোবাংলার তহবিলে ২৫ হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে রয়েছে। তাই গ্যাসের দাম বর্তমানে বাড়ানো যৌক্তিক হবে না। এতে সার্বিক অর্থনীতি ও জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়বে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, মানুষ বাসাবাড়িইে গ্যাস পাচ্ছে না। প্রি-পেইড মিটারে যে অল্পসংখ্যক বাসাবাড়িতে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর অভিজ্ঞতা থেকেই দেখা যায়, মানুষ চুলাপ্রতি বিল হিসেবে বেশি টাকা খরচ করছে। এখন আবার দাম বৃদ্ধি অন্যায় ও অন্যায্য।


বিদ্যুৎ/জ্বালানি'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি